গৌরীকাণ্ডে অভিযুক্ত বিজয় দাসের গণরোষে মৃত্যুর পরেও জনতা তৃপ্ত হয়নি। তারা চাইছে পুলিশ হেফাজতে থাকা আরেক অভিযুক্ত জয় দাসকেও একই শাস্তি দেওয়া হোক। হয়তো পুলিশ গ্রেপ্তার করাতেই জয় দাস এখনও জীবিত। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে মিডিয়া মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে। এনকাউন্টারের দাবি তুলে জনতার প্রশংসা কুড়িয়েছেন বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা সৃজন মাইতি। শাসক শিবিরে গোপন তোড়জোড় শুরু হয়েছে কীভাবে একটা ফেক এনকাউন্টার ঘটানো যায়। তাহলেই ২০১৯ সালের তেলেঙ্গানা সরকারের মতো সারা ভারতব্যাপী বাহবা পেয়ে যাবে রাজ্যের শাসক দল। জনতা এই তিনটের যে কোনো একটা হলেই ভীষণ খুশি। হয় মৃত্যুদণ্ড, না হয় এনকাউন্টার, নচেৎ জয় দাসকেও তুলে দেওয়া হোক জনতার হাতে। তৃতীয়টাতেই জনতার আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। কারণ এতে জনতার দৈহিক ও মানসিক তৃপ্তি আসে। তাছাড়া বিজয় দাসকে যেভাবে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরলতম। একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যাবে গৌরীকাণ্ডে মূল অপরাধের চেয়েও দ্বিগুণ ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল তার শাস্তি যখন জনতার তীব্র রোষের সামনে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় অভিযুক্ত বিজয় দাস। সকলেই এতে খুশি ছিল। কিন্তু এর বিরুদ্ধে একমাত্র প্রশ্ন তুলেছিল মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীরা।

"আমরা মানুষ" পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানবাধিকার সংগঠন। তার সম্পাদক শিবম ভট্টাচার্য মিছিল বার করলেন। জনতা যেভাবে অভিযুক্তকে বিচার না করেই হত্যা করেছে তার তীব্র প্রতিবাদ করলেন তিনি।
মিছিল এগিয়ে চলেছে বিজয় দাসের হত্যার প্রতিবাদে। মিছিলে লোক নেই। খুব বেশি হলে কুড়ি জন। লোক কম থাকার কারণ সাধারণ মানুষের "আমরা মানুষ" সংগঠনের এই দাবিটাই পছন্দ নয়। কারণ "আমরা মানুষ" সংগঠনটি মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী, এনকাউন্টারের বিরোধী আবার জনরোষে মৃত্যুরও বিরোধী। "এ আবার কোথাকার জীব?" — সকলের এটাই ধারণা।
হঠাৎ এই মিছিলটাকে ঘিরে ধরল Gen Z সভ্যতার কিছু বীর যুবক-যুবতী। যারা সংখ্যায় প্রায় ৫০-৬০ জন। মিছিলের পথ আটকে মানবাধিকার কর্মীদের তুই-তোকারি করা শুরু করল তারা। শিবম বাবুর পথ আটকে রেখে এক অতিকায় বীর যুবক জিজ্ঞাসা করলেন, "কীরে বুদ্ধিজীবীদের দল! আবার অপরাধীদের পাশে দাঁড়িয়েছিস? মার খাবি?"
"না। ভাই তোমরা ভুল করছ।" শিবম বাবু বললেন, "আমরা কারও পাশে দাঁড়াইনি। আমরা শুধু...."
"আঁতলেমি করতে বেরিয়েছিস?" অতিকায় যুবক উত্তর দিল।
পাশ থেকে আরেকজন চুলে স্পাইক করা অল্পবয়সী ছেলে উত্তর দিল, "এরাই হলো আসল জঙ্গি। এরা জঙ্গিদের সমর্থক। অপরাধীদের সমর্থক। চীনের দালাল। চায়নার থেকে কোটি কোটি টাকা খায়। এরা মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। এরা এনকাউন্টারের বিরোধী। এদের ফেলে পেটানো দরকার।"
হঠাৎ করে অতিকায় যুবক শিবম বাবুকে এক ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দিল। হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। মানবাধিকার কর্মীরা ২০ জন। আর তাদের বিরুদ্ধে ৫০ জন। এই অসম লড়াইয়ে হেরে আহত হয়ে যে যার মতো ছুটে পালাল মানবাধিকার কর্মীরা।
"মার মার, বাঁদরগুলোকে মার" — এই বলে তাদের পিছনে তাড়া করল বীর যুবকরা।

আদালত থেকে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার পর জয় দাসকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল অকুস্থলে। আইনি ভাষায় যাকে বলে 'এভিডেন্স রিকভারি'। পেট্রোল পাম্পের সিসিটিভি ফুটেজে জয় আর বিজয়কে দেখা গেছে—পুলিশের কাছে এটাই ছিল অপরাধের অকাট্য প্রমাণ। জয় বারবার চিৎকার করে বলতে চেয়েছিল যে তারা সেখানে কেন গিয়েছিল, কিন্তু আই.সি. বাগচীর কাছে ওই ফুটেজটাই ছিল শেষ কথা।

বিকেল তিনটে। হাইওয়ে থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা নির্জন খাদের ধারে পুলিশ জিপটা এসে থামল। জিপে ছিলেন ইনস্পেক্টর-ইন-চার্জ (IC) সমীরণ বাগচী, একজন সাব-ইনস্পেক্টর এবং দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল।
আই.সি. বাগচী জিপ থেকে নেমে একটা সিগারেট ধরালেন। জয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "নামো। এখানে আর হাতকড়া পরে থাকার দরকার নেই। পালাবি তো এই ভাঙা পা নিয়ে?"

জয় জিপ থেকে নামল। দুদিন ধরে চলা লক-আপের অত্যাচারে তার সারা শরীরে কালশিটে। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "স্যার, বিশ্বাস করুন, সিসিটিভিতে যা দেখছেন তা সত্যি নয়। আমরা উমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম—"
"উমা? উমা আবার কে?" বাগচী সাহেব ধোঁয়া ছেড়ে ভ্রু কুঁচকালেন। "বেশি স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করিস না জয়।"
"আরেকটু ভেতরে যা জয়। অত ভয় কিসের?" বাগচী সাহেবের কণ্ঠস্বরে একটা বিদ্রূপ মিশে থাকল।
জয় ঝোপের একদম মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।
হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ ধাতব শব্দ। আই.সি. বাগচী নিজের সার্ভিস রিভলভারটা বার করেছেন।
"স্যার! কী করছেন? আমি তো পালাচ্ছি না!"
"আমি তোকে সেই জাস্টিসটাই দিচ্ছি।"

পরপর দুটো গুলি। জয়ের ডান দিকের পাঁজরের হাড় চুরমার করে দিয়ে গুলি দুটো ভেতরে ঢুকে গেল।
জয় শেষবার বিড়বিড় করল, "উমা... দাদারা আসতে পারল না রে..."
রক্তাক্ত ধুলোয় মুখ থুবড়ে পড়ে রইল জয় দাস। বাগচী সাহেব পকেট থেকে রুমাল বার করে রিভলভারটা মুছলেন। তারপর ওয়্যারলেসটা বার করে কন্ট্রোল রুমে মেসেজ পাঠালেন—
"সাবজেক্ট জয় দাস পুলিশ কাস্টডি থেকে পালানোর চেষ্টা করছিল। সেলফ ডিফেন্সে গুলি চালাতে হয়েছে।সাবজেক্ট ইজ স্পট ডেড।"