পশ্চিমবঙ্গ স্কুলে মর্নিং শিফট চালুর অনুমতি, তীব্র গরমে শিক্ষা দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি
রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ এবং অস্বাভাবিক গরমের পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্কুল শিক্ষা দপ্তর। ১ জুন ২০২৬ তারিখে শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি সরকারি মেমো জারি করে জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকদের (District Inspector of Schools) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, যেসব জেলায় তীব্র গরম পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেখানে স্কুল কর্তৃপক্ষ চাইলে আগামী দুই সপ্তাহের জন্য মর্নিং শিফটে বা সকালের সময়ে ক্লাস পরিচালনা করতে পারবে। এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে তাদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
সরকারি মেমোর বিস্তারিত
স্কুল শিক্ষা দপ্তরের জারি করা মেমো নম্বর 700(23)-SED-15099/196/2026, তারিখ 01.06.2026-এ বলা হয়েছে যে রাজ্যের কিছু জেলায় বর্তমানে তীব্র গরম পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। যখনই কোনো অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ বা অস্বাভাবিক গরম দেখা দেয়, তখন স্কুলগুলির সময়সূচি পরিবর্তন করে মর্নিং শিফটে পরিচালনা করা হয়। এবারও সেই একই নীতি অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্কুল কর্তৃপক্ষ আগামী দুই সপ্তাহের জন্য সকালের শিফটে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
কোন এলাকায় প্রযোজ্য?
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের সমস্ত জেলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও পার্বত্য এলাকাগুলিকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
মেমোতে স্পষ্টভাবে “All Districts (Except Hill Areas)” উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ দার্জিলিং এবং অন্যান্য পাহাড়ি অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলির ক্ষেত্রে এই নির্দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়।
এর প্রধান কারণ হলো পাহাড়ি এলাকার আবহাওয়া পরিস্থিতি সমতল এলাকার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে দক্ষিণবঙ্গ এবং পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা তীব্র গরমের মুখোমুখি হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ি অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া বিরাজ করছে।
মর্নিং শিফট কি বাধ্যতামূলক?
এই নির্দেশিকা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশ নয়।
সরকারি নোটিশে কোথাও বলা হয়নি যে সমস্ত স্কুলকে বাধ্যতামূলকভাবে মর্নিং শিফটে যেতে হবে। বরং স্থানীয় পরিস্থিতি, আবহাওয়া এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্কুল কর্তৃপক্ষের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ফলে কোনো স্কুল যদি মনে করে তাদের এলাকায় গরম পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তাহলে তারা মর্নিং শিফটে ক্লাস পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আবার কোনো এলাকায় যদি আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে সহনীয় হয়, তাহলে সেখানে স্বাভাবিক সময়সূচিও বজায় রাখা যেতে পারে।
কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?
শিক্ষা দপ্তরের নোটিশে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গ্রীষ্মকালে দুপুরের সময় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই সময়ে স্কুলে যাতায়াত করা বা দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা তীব্র গরমে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
- শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে
- পড়াশোনার ক্ষতি কমাতে
- স্কুল বন্ধ না করে বিকল্প ব্যবস্থা চালু রাখতে
- গরমের ঝুঁকি কমাতে
সরকারি নোটিশে স্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপর জোর
মেমোতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় আবহাওয়া পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অর্থাৎ শুধু ক্লাস নেওয়াই লক্ষ্য নয়, বরং শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে সেটাই প্রধান উদ্দেশ্য।
এই নির্দেশিকায় শিক্ষার্থীদের একাডেমিক স্বার্থ এবং স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে।
আগামী দুই সপ্তাহ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারি নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে আগামী দুই সপ্তাহের কথা বলা হয়েছে।
এর অর্থ হলো শিক্ষা দপ্তর বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িকভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
যদি এই সময়ের মধ্যে আবহাওয়ার উন্নতি হয় এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে, তাহলে স্কুলগুলো আবার স্বাভাবিক সময়সূচিতে ফিরে যেতে পারে।
অন্যদিকে যদি তাপপ্রবাহ আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন নির্দেশিকা জারি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
স্কুলগুলিকে কী করতে বলা হয়েছে?
সরকারি মেমোতে জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলিকে বিষয়টি জানিয়ে দেয়।
একই সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষকে সময়মতো তথ্য পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে যাতে—
- শিক্ষক-শিক্ষিকারা প্রস্তুতি নিতে পারেন
- শিক্ষার্থীরা নতুন সময়সূচি জানতে পারে
- অভিভাবকরা আগাম ব্যবস্থা নিতে পারেন
- শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো বিভ্রান্তি না তৈরি হয়
অভিভাবকদের কী করা উচিত?
এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
যেসব অভিভাবকের সন্তান স্কুলে পড়াশোনা করে তাদের উচিত—
- স্কুলের নোটিশ নিয়মিত দেখা
- অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ পর্যবেক্ষণ করা
- নতুন সময়সূচি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া
- শিশুদের পর্যাপ্ত জল পান করানো
- জলভর্তি বোতল স্কুলে পাঠানো
- হালকা সুতির পোশাক পরতে উৎসাহিত করা
শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
তীব্র গরমের সময় শিক্ষার্থীদের কয়েকটি বিষয় মেনে চলা উচিত।
- পর্যাপ্ত জল পান করতে হবে
- খালি পেটে স্কুলে যাওয়া যাবে না
- রোদে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এড়াতে হবে
- অসুস্থ বোধ করলে শিক্ষককে জানাতে হবে
- প্রয়োজনে ওআরএস পান করতে হবে
- ছাতা বা টুপি ব্যবহার করা উচিত
বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি
রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় গত কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের বহু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে অবস্থান করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত আর্দ্রতা, যা গরমের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্তের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা দপ্তরের এই পদক্ষেপ একটি বাস্তবসম্মত এবং ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
একদিকে শিক্ষাবর্ষের ক্ষতি কমানো হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্কুল সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা না করে মর্নিং শিফটের সুযোগ দেওয়া প্রশাসনিক নমনীয়তার একটি উদাহরণ।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
আগামী কয়েক সপ্তাহের আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
যদি গরম পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে শিক্ষা দপ্তর নতুন নির্দেশিকা জারি করতে পারে।
প্রয়োজনে—
- মর্নিং শিফটের মেয়াদ বাড়ানো
- অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবিধি জারি করা
- স্কুল সময়সূচিতে আরও পরিবর্তন আনা
এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
উপসংহার
১ জুন ২০২৬ তারিখে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের জারি করা এই নির্দেশিকা মূলত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে তীব্র গরম পরিস্থিতির কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী আগামী দুই সপ্তাহের জন্য স্কুলগুলিকে মর্নিং শিফটে পরিচালনার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশ নয়। স্থানীয় আবহাওয়া ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের স্বার্থ রক্ষা করেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতিতে শিক্ষা দপ্তরের এই পদক্ষেপকে সময়োপযোগী এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব উদ্যোগ বলেই মনে করছেন শিক্ষা মহলের একাংশ।