Vidyanjali Programme in Schools 2026: রাজ্য স্কুল শিক্ষা দপ্তরের নতুন নির্দেশিকা এবং স্কুলে ‘বিদ্যাঞ্জলি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্পূর্ণ নির্দেশনাবলী
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের অধীনস্থ পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন (PBSSM) রাজ্যজুড়ে সমস্ত সরকারি এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে ‘বিদ্যাঞ্জলি’ প্রকল্প বা Vidyanjali Programme ইন স্কুলস বাস্তবায়নের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে। ২০ মে, ২০২৪ তারিখে প্রকাশিত এই প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশপত্রের (Memo No: 02(72)/CM&AS/111/PBSSM/2026-27) মূল উদ্দেশ্য হলো রাজ্যের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামো এবং সামগ্রিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা। সমাজের সাধারণ মানুষ, বেসরকারি সংস্থা এবং প্রাক্তন পড়ুয়াদের সরাসরি স্কুলের উন্নয়নমূলক কাজের সাথে যুক্ত করতেই এই বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
ভূমিকা এবং পটভূমি:
রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বেশি জনমুখী এবং পরিকাঠামোগতভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন (PBSSM) এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের নির্দেশিকা মেনে রাজ্যে এই Vidyanjali Programme বা বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যালয়গুলির সার্বিক উন্নতির জন্য কেবল সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর না থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের সচেতন নাগরিক, কর্পোরেট সেক্টর এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের সুযোগ করে দেওয়া। রাজ্যের সমস্ত জেলার স্কুল পরিদর্শক (DI Primary and Secondary) এবং ডিস্ট্রিক্ট প্রাইমারি স্কুল কাউন্সিলের (DPSC) চেয়ারম্যানদের এই নির্দেশিকা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প আসলে কী এবং এর মূল উদ্দেশ্য কী:
বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প (Vidyanjali Programme) হলো একটি অনন্য স্কুল ভলান্টিয়ার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম বা বিদ্যালয় স্বেচ্ছাসেবী পরিচালনা ব্যবস্থা। এটি মূলত একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে পরিচালিত হয় যেখানে একদিকে দেশের বা রাজ্যের সরকারি বিদ্যালয়গুলি তাদের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এবং অন্যদিকে ইচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবক বা দাতারা সেই চাহিদা অনুযায়ী সাহায্য করতে পারেন।
এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি নিচে উল্লেখ করা হলো:
- সরকারি এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলির শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটানো।
- বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করা।
- সমাজের সচেতন নাগরিক, বেসরকারি ক্ষেত্র এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের উন্নয়নের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা।
- একটি স্বচ্ছ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিদ্যালয় এবং দাতার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা।
বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্পের শর্তাবলী এবং অবদানের ক্ষেত্রসমূহ:
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিল থেকে বিদ্যালয়ে প্রধানত দুটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অবদান রাখা যাবে। এই অবদানের শর্তাবলী নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পরিষেবা বা অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে অবদান (Contribution in Service or Activity):
যে সমস্ত ব্যক্তি বা স্বেচ্ছাসেবী সরাসরি নিজের শ্রম বা মেধা দিয়ে বিদ্যালয়কে সাহায্য করতে চান, তারা দুটি ভাগে এই কাজ করতে পারবেন:
- জেনেরিক স্তরের পরিষেবা (Generic Level Services): এর অধীনে কোনো দক্ষ ব্যক্তি বিদ্যালয়ে গিয়ে সরাসরি পড়ুয়াদের ক্লাস নিতে পারেন, বিশেষ কোনো বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠ দিতে পারেন বা বিভিন্ন ধরণের সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলী পরিচালনা করতে পারেন।
- স্পনসরশিপ কার্যক্রম (Sponsorship Activities): বিদ্যালয় স্তরের কোনো বিশেষ প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া অনুষ্ঠান বা শিক্ষামূলক ভ্রমণের খরচ স্পনসর করার সুযোগও এই বিভাগের অধীনে রয়েছে।
২. সম্পদ, সামগ্রী বা সরঞ্জাম দান (Contribution of Asset or Material or Equipment):
বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত শূন্যস্থান পূরণ করতে দাতারা সরাসরি বিভিন্ন ধরণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বা সম্পদ প্রদান করতে পারেন। এই সম্পদ দানের ক্ষেত্রগুলিকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
- মৌলিক পরিকাঠামো (Basic Civil Infrastructure): ক্লাসরুম মেরামত, পানীয় জলের ব্যবস্থা বা শৌচাগার সংস্কারের মতো সিভিল পরিকাঠামো নির্মাণে সাহায্য করা যাবে।
- বৈদ্যুতিক পরিকাঠামো (Basic Electrical Infrastructure): বিদ্যালয়ে আলো, পাখা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা।
- ক্লাসরুম ও শিক্ষা সহায়ক সামগ্রী (Classroom Support Materials and TLM): বেঞ্চ, টেবিল, ব্ল্যাকবোর্ড, চক, ডাস্টার এবং বিভিন্ন ধরণের টিচিং লার্নিং মেটেরিয়াল (TLM) দান করা।
- ডিজিটাল পরিকাঠামো (Digital Infrastructure): বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য কম্পিউটার, প্রজেক্টর, স্মার্ট বোর্ড, ইন্টারনেট সংযোগ বা ল্যাপটপ প্রদান করা।
- ক্রীড়া ও অতিরিক্ত পাঠ্যক্রমিক সরঞ্জাম (Sports and Extra-Curricular Equipment): খেলাধুলার সামগ্রী, যোগাসনের ম্যাট এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র দান করা।
- স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা (Health and Safety Aids): বিদ্যালয়ে ফার্স্ট এইড বক্স, স্যানিটাইজার বা অন্যান্য সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম প্রদান করা।
- রক্ষণাবেক্ষণ ও অফিস আসবাব (Maintenance and Office Furniture): বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষের আসবাবপত্র এবং সামগ্রিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য করা।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং বিদ্যালয় নিবন্ধীকরণ:
রাজ্যের সমস্ত সরকারি ও সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি বিদ্যালয়কে বিদ্যাঞ্জলি পোর্টালে বাধ্যতামূলকভাবে নাম নথিভুক্ত বা রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
নিবন্ধীকরণের মূল ধাপগুলি নিম্নরূপ:
- প্রথমত, যে সমস্ত বিদ্যালয়ের নিজস্ব এবং সক্রিয় UDISE+ (Unified District Information System for Education Plus) কোড রয়েছে, শুধুমাত্র তারাই এই পোর্টালে অংশ নিতে পারবে।
- দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিদ্যাঞ্জলি পোর্টালে গিয়ে তাদের নির্দিষ্ট UDISE+ কোডটি ইনপুট করতে হবে।
- তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানের যে মোবাইল নম্বরটি UDISE+ পোর্টালে রেজিস্টার্ড রয়েছে, সেই নম্বরে একটি ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপি (OTP) পাঠানো হবে।
- চতুর্থত, সেই ওটিপি সফলভাবে ভেরিফাই করার পর বিদ্যালয়ের প্রোফাইলটি সক্রিয় হয়ে যাবে এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তাগুলি পোর্টালে আপলোড করতে পারবেন।
পর্যালোচনা এবং উপযুক্ততা যাচাইকরণ:
নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, কোনো স্বেচ্ছাসেবী বা সংস্থা কোনো বিষয়ে অবদান রাখতে চাইলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি তা গ্রহণ করতে পারবেন না। দাতার ব্যাকগ্রাউন্ড, সেবার মানসিকতা এবং প্রস্তাবিত সামগ্রীর গুণগত মান সরকারি গাইডলাইন বা নির্দেশিকা মেনে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (SMC) বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি সন্তুষ্ট হন যে সংশ্লিষ্ট অবদানটি শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং উপযোগী, তবেই তা গ্রহণ করা যাবে।
ভবিষ্যতের প্রভাব এবং সামাজিক গুরুত্ব:
বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। গ্রামীণ বা মফস্বলের অনেক স্কুল রয়েছে যেখানে সরকারি অনুদান পৌঁছাতে বা পরিকাঠামো তৈরি হতে সময় লাগে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরের ব্যবসায়ী, প্রবাসী প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী বা বড় কোনো আইটি কোম্পানি তাদের সিএসআর ফান্ডের মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যালয়ের রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হবে। এর ফলে সরকারি স্কুলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনই ছাত্রছাত্রীরা আরও উন্নত এবং আধুনিক পরিবেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পাবে।
সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাস্য বা এফএকিউ (FAQ):
প্রশ্ন ১: বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্পে কি কোনো সাধারণ নাগরিক অংশ নিতে পারেন?
উত্তর: হ্যাঁ, সমাজের যেকোনো সচেতন নাগরিক, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত চাকুরিজীবী বা যেকোনো পেশাদার ব্যক্তি এই প্রকল্পে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশ নিতে পারেন।
প্রশ্ন ২: এই প্রকল্পে সাহায্য করার জন্য কি সরাসরি কোনো নগদ টাকা দেওয়া যাবে?
উত্তর: সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, নগদ অর্থ সরাসরি গ্রহণ করার কোনো নিয়ম এই পোর্টালে নেই। দাতাদের সরাসরি পরিষেবা দিতে হবে অথবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে বিদ্যালয়ে প্রদান করতে হবে।
প্রশ্ন ৩: কোনো বিদ্যালয় কীভাবে তাদের চাহিদার কথা জানাবে?
উত্তর: প্রতিটি বিদ্যালয়কে তাদের UDISE+ কোড ব্যবহার করে বিদ্যাঞ্জলি পোর্টালে লগইন করতে হবে এবং সেখানে তাদের পরিকাঠামোগত বা শিক্ষামূলক প্রয়োজনের তালিকা আপলোড করতে হবে।
প্রশ্ন ৪: স্বেচ্ছাসেবীদের যোগ্যতা কীভাবে নির্ধারিত হবে?
উত্তর: সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী আবেদনকারী স্বেচ্ছাসেবীর যোগ্যতা এবং প্রস্তাবিত সামগ্রীর গুণগত মান যাচাই করা হবে। সমস্ত দিক খতিয়ে দেখার পরেই চূড়ান্ত অনুমতি দেওয়া হবে।
প্রশ্ন ৫: এই প্রকল্পে কি বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা যুক্ত হতে পারেন?
উত্তর: হ্যাঁ, এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হলো বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের স্কুলের উন্নয়নে শামিল হওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ করে দেওয়া।
উপসংহার:
পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশনের এই নতুন নির্দেশিকা রাজ্যের বিদ্যালয় শিক্ষার পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সরকারি প্রচেষ্টার সাথে যদি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনভীতির সঠিক সমন্বয় ঘটানো যায়, তবে বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প আগামী দিনে রাজ্যের প্রতিটি সরকারি স্কুলের চালচিত্র বদলে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলিতে জেলা স্তর থেকে শুরু করে প্রতিটি গ্রামীণ বিদ্যালয়ে এই নির্দেশিকা কতখানি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।