২০২৬ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি। দিনটি ক্যালেন্ডারের পাতায় সাধারণ মনে হলেও দুই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এটি একটি 'প্যারাডক্স' বা বৈপরীত্যের মহাকাব্য হয়ে থাকবে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি অলি-গলিতে, নবান্নের করিডোরে কিংবা ধর্মতলার জনসভায়—একটি শব্দ শুনলে মানুষের ধমনীতে রক্তচাপ বেড়ে যায়, তা হলো 'তৃণমূল'। আমাদের এপার বাংলায় গত দেড় দশক ধরে এই নামটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং মা-মাটি-মানুষের এক অভেদ্য আবেগের নাম। কিন্তু গঙ্গার সেই প্রবল ঢেউ যখন সীমান্ত পেরিয়ে ওপাারের বাংলাদেশে আছড়ে পড়ল, তখন এক অদ্ভুত এবং রহস্যময় দৃশ্যের অবতারণা হলো।
বাংলাদেশের ১৩তম সংসদ নির্বাচনের ফলাফল যখন একে একে কমিশনের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সচেতন পাঠকদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সেখানেও লড়ছিল একটি 'তৃণমূল'। ১৩৫ জন প্রার্থী, বিশাল প্রচার আর ডিজিটাল দুনিয়ায় বিপুল শোরগোল। কিন্তু ব্যালট বাক্স যখন খুলল, দেখা গেল এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য দৃশ্য। পশ্চিমবঙ্গের যে নাম অপরাজেয়, ওপাারে সেই নাম যেন এক অলৌকিক শূন্যতায় বিলীন হয়ে গেল। ১৩৫ জন প্রার্থী মিলে সারা দেশে ভোট পেয়েছেন মাত্র ৩.৫ লক্ষ! এই গাণিতিক ধাঁধাটি কেন আমাদের পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের জন্য এক বিশাল বিস্ময়, আজ সেই রহস্যের পরতগুলোই উন্মোচন করবে 'পদাতিক বাংলা'।
নামের মায়াজাল: এপার বাংলা বনাম ওপার বাংলা
রাজনীতি কি কেবলই আদর্শের লড়াই? নাকি এটি শব্দের এক সুনিপুণ মায়াজাল? আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গে থাকি, আমাদের কাছে তৃণমূল মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ সংগ্রাম। কিন্তু সীমান্তের ওপাারে এই নামের মাহাত্ম্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মোড় নিয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনী রণাঙ্গনে যে তৃণমূলের মহাবিপর্যয় আমরা দেখলাম, তা আসলে পশ্চিমবঙ্গের 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' (TMC) নয়। এটি ছিল 'তৃণমূল বিএনপি' (Trinomool BNP)।
এখানেই লুকিয়ে আছে সেই রাজনৈতিক জাদুকরী রহস্য। কেন বাংলাদেশের একটি দল পশ্চিমবঙ্গের সফলতম দলটির নাম ধার করল? এটি কি কেবলই ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ, নাকি ভোটারদের মনে এক বিভ্রান্তিকর মায়া তৈরি করার কৌশল? ২০২৬-এর নির্বাচনে বাংলাদেশের ভোটাররা এই নামের ধাঁধায় পা দেননি। তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, গঙ্গার এপাারের জাদুমন্ত্র ওপাারের মাটিতে সবসময় কাজ করে না। নাম ধার করা যায়, কিন্তু সেই নামের পেছনের জনভিত্তি বা 'Legacy' কখনও ধার করা সম্ভব নয়।
১৩৫ প্রার্থীর সেই অদৃশ্য অভিযাত্রা: প্রচার বনাম বাস্তবতা
২০২৬-এর নির্বাচনের মাসখানেক আগে থেকেই বাংলাদেশের মিডিয়া পাড়ায় এক প্রবল গুঞ্জন ছিল। বলা হচ্ছিল, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যখন মূল স্রোতে ফিরছে, তখন এই 'তৃণমূল বিএনপি' হতে পারে এক বিশাল 'কিং মেকার' বা তৃতীয় শক্তি। ওপাারের তৃণমূলের মতো এপাারেও তারা এক বিশাল নীরব বিপ্লব ঘটাবে—এমনটাই ছিল তাদের নেতাদের বাগাড়ম্বর। তারা দেশের আনাচে-কানাচে ১৩৫ জন হেভিওয়েট প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন একসময়ের ডাকসাইটে নেতা।
মাঠপর্যায়ে তাদের কর্মীদের দৌড়ঝাঁপ আর রঙিন পোস্টার দেখে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেছিলেন, অন্তত ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভোট তারা নিজেদের ঝুলিতে টানতে পারবে। কিন্তু ১৩ই ফেব্রুয়ারি বিকেল হতে না হতেই সেই জাদুর বেলুন সশব্দে ফেটে গেল। কমিশনের চূড়ান্ত তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে এই ১৩৫ জন প্রার্থী মিলে মোট ভোট পেয়েছেন মাত্র ৩ লক্ষ ৪১ হাজার থেকে ৩ লক্ষ ৭৯ হাজার (আনুমানিক)। শতাংশের হিসেবে যা মাত্র ০.৪৬%। পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে এটি স্রেফ অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কারণ এখানে তৃণমূলের ভোট শতাংশ সবসময়ই আকাশচুম্বী। কিন্তু ওপাারে কেন এই 'তৃণমূল' এক শতাংশের গণ্ডিও পেরোতে পারল না?
রহস্যভেদ: এটি কি মমতার তৃণমূল?
আমাদের পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের মনে এই প্রশ্নটি আসা স্বাভাবিক—আমাদের দিদির দল কি তবে বাংলাদেশে গিয়ে হারল? উত্তরটি হলো একটি বজ্রকঠিন 'না'। বাংলাদেশের এই 'তৃণমূল বিএনপি' সম্পূর্ণ আলাদা একটি রাজনৈতিক সত্তা। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রয়াত ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, যিনি একসময় বিএনপির অত্যন্ত ক্ষমতাধর মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বিএনপির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই নতুন দলটি গঠন করেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে শমসের মবিন চৌধুরী এবং তৈমুর আলম খন্দকারের নেতৃত্বে দলটি নতুন করে প্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করে। তারা চেয়েছিল বিএনপির মূল ভোটারদের একটি অংশকে নিজেদের দিকে টানতে। কিন্তু ট্র্যাজেডিটা অন্য জায়গায়। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল যেখানে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে 'মা-মাটি-মানুষ' স্লোগানে মিশে আছে, বাংলাদেশের এই দলটি পরিচিতি পেয়েছিল একটি 'সুবিধাবাদী' বা সরকারি আনুকূল্যপ্রত্যাশী শক্তি হিসেবে। ভোটাররা মনে করেছেন, নামের এই মিলটি কেবলই একটি রাজনৈতিক আবরণ। ফলে, ওপাারের তৃণমূলের সেই যে প্রবল জোয়ার, তা বাংলাদেশের সীমান্তে এসে এক অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেছে।
২০২৬-এর জাদুকরী পরিসংখ্যান: কেন এই ধস?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬-এর নির্বাচন ছিল মূলত 'আসল' বনাম 'নকলের' লড়াই। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেল, তারা কোনো ছায়া বা বিভ্রান্তিকর নামের পেছনে ছোটেনি। তারা সরাসরি মূল শক্তির দিকেই ধাবিত হয়েছে।
নামের ওজন বনাম শূন্যতা: 'তৃণমূল' শব্দটি ওপাারে (পশ্চিমবঙ্গ) যতটা শক্তিশালী এবং অর্থবহ, এপাারে তা ছিল অপরিচিত এবং কিঞ্চিৎ হাস্যকর।
প্রতীক বিভ্রাট: তাদের প্রতীক ছিল 'সোনালী আঁশ' (পাট)। পশ্চিমবঙ্গের জোড়া ফুল যেমন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, এই সোনালী আঁশ তা পারেনি।
আস্থার সংকট: ১৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রায় সবারই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে কেবল একটি সফল নাম ধার করে বা গ্ল্যামার তৈরি করে জনমত গঠন করা সম্ভব নয়।
সীমানা ও শূন্যতা: পদাতিক বাংলার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি
গঙ্গার এপাারে যা জনসমুদ্রের গর্জন, ওপাারে কেন তা নিথর নিস্তব্ধতা? এটি কি কেবলই ভূ-রাজনীতি? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ? 'পদাতিক বাংলা' মনে করে, রাজনীতি চলে মাটির টানে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের শেকড় এখানকার মানুষের দীর্ঘ লড়াকু আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশের এই তৃণমূল ছিল একটি চারাগাছ, যা অন্য বন থেকে নাম ধার করে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। বাংলাদেশের মাটি একে গ্রহণ করেনি। এটি একটি রাজনৈতিক 'অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট' ব্যর্থ হওয়ার মতো ঘটনা।
মিডিয়া হাহাকার ও নীরব ভোটার
নির্বাচনের আগের রাতেও অনেক নামী-দামী সংবাদমাধ্যম প্রচার করেছিল যে, তৃণমূল বিএনপি অন্তত ১০-১৫টি আসনে জয়ী হতে পারে। কিন্তু ভোটাররা যখন বুথে ঢুকলেন, তারা কোনো নামের মায়াজালে আটকা পড়লেন না। তারা দেখলেন, যে দলটির ১৩৫ জন প্রার্থীর লড়াইয়ের সক্ষমতা নেই, তাদের ভোট দিয়ে লাভ কী? ৩.৫ লক্ষ ভোট মানে হলো প্রতি আসনে গড়ে ২,৫০০ ভোটও তারা পায়নি। এটি একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের জন্য কেবল পরাজয় নয়, এটি একটি লজ্জাজনক পরিসংখ্যান।
উপসংহার: ধাঁধা যখন ধ্রুব সত্যে পরিণত হয়
বাংলাদেশের ১৩তম সংসদ নির্বাচন আমাদের পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেল। নাম এক হতে পারে, কিন্তু সেই নামের পেছনের সংগ্রাম এবং মানুষের আস্থা এক না হলে ফলাফল হয় 'শূন্য'। ১৩৫ আসনে লড়াই করে ৩.৫ লক্ষ ভোট পাওয়াটা তৃণমূল বিএনপি-র জন্য কেবল রাজনৈতিক মৃত্যু নয়, এটি একটি অদ্ভুত ধাঁধার সমাপ্তি।
গঙ্গার এপাারে যে নাম অপরাজেয় সিংহাসন, ওপাারে কেন তা কেবলই অদৃশ্য কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল—সেই রহস্য হয়তো আগামী দিনের ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। তবে আজকের মতো এটুকু স্পষ্ট যে, সীমানা পেরোলেই নামের জাদু সবসময় কাজ করে না। বাংলাদেশের মাটিতে 'তৃণমূল' নামটির কোনো জাদুকরী প্রভাব খাটেনি, বরং তা এক অমিমাংসিত ধাঁধা হয়েই রয়ে গেল 'পদাতিক বাংলা'-র পাতায়। ৩.৫ লক্ষ ভোটের এই অংকটি আসলে একটি আয়না, যা আমাদের রাজনীতির সেই রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে, যেখানে নামের চেয়ে কাজের মূল্যই বেশি।