নিজস্ব সংবাদদাতা, ডায়মন্ড হারবার ও কলকাতা: ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখটি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে এক কালিমালিপ্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। লোকসভার বাজেট অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষা মন্ত্রকের দেওয়া একটি লিখিত বিবৃতি দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বাম আমলে নিযুক্ত প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য এই খবর যেন বিনামেঘে বজ্রপাত। দীর্ঘ দেড় দশকের টানাপোড়েন, আইনি লড়াই এবং প্রশাসনিক টালবাহানার পর কেন্দ্রের এই 'শেষ উত্তর' কার্যত এক বিশাল সংখ্যক শিক্ষক পরিবারের জীবন ও জীবিকার লড়াইকে শেষের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ডায়মন্ড হারবার থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ— সর্বত্র আজ কান্নার রোল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: আরটিই আইন ও ২০১০ সালের সেই বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তি:
শিক্ষক নিয়োগের এই সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড় দশক আগে। ২০০৯ সালে যখন 'নিঃशुल्क এবং বাধ্যতামূলক শিশু শিক্ষার অধিকার আইন' (RTE Act) পাস হয়, তখন থেকেই গুণগত শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া শুরু হয়েছিল। এই আইনের ধারা ২৩-এর উপ-ধারা (১) অনুযায়ী, ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন (NCTE) ২০১০ সালের ২৩শে আগস্ট একটি ঐতিহাসিক গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এই বিজ্ঞপ্তিতেই প্রথমবারের মতো ঘোষণা করা হয় যে, প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হতে গেলে ন্যূনতম যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে 'শিক্ষক पात्रতা পরীক্ষা' বা টেট (TET) পাস করা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় সেই শিক্ষকদের নিয়ে, যারা এই নিয়ম চালু হওয়ার আগে অর্থাৎ ২০১১ সালের আগে থেকেই চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে বাম আমলে নিয়োগের ক্ষেত্রে টেট-এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ফলে কয়েক দশক ধরে সুনামের সাথে পড়ানো এই শিক্ষকদের ওপর হঠাৎ করে নতুন নিয়ম চাপিয়ে দেওয়াকে অনেকেই 'Administrative Injustice' হিসেবে গণ্য করেন। লোকসভায় সাংসদ লালজি বর্মার ১৬০৬ নম্বর প্রশ্নের মূল ভিত্তিও ছিল এই ঐতিহাসিক বৈষম্য।
লোকসভার সেই অভিশপ্ত ৯ই ফেব্রুয়ারি: ধ্বংসের মুষল প্রসব:
সাংসদ শ্রী লালজি বর্মা সংসদে জানতে চেয়েছিলেন, ২০১১-র আগে নিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য সরকার কোনো 'Uniform National Policy' বা অভিন্ন জাতীয় নীতি তৈরি করে তাঁদের টেট থেকে পুরোপুরি ছাড় দেবে কিনা। এর উত্তরে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত চৌধুরী যে লিখিত বয়ান পেশ করেছেন, তাকেই বিশ্লেষকরা 'ধ্বংসের মুষল' বলে অভিহিত করছেন।
সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, আরটিই আইনের আওতায় টেট একটি সংবিধিবদ্ধ এবং বাধ্যতামূলক ন্যূনতম যোগ্যতা। এটি কোনো প্রশাসনিক বাধা নয়, বরং শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। কেন্দ্র স্পষ্ট করেছে যে, ২০১১-র আগে নিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য আলাদা কোনো শিথিলকরণ বা ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের নেই। মন্ত্রকের এই অনমনীয় অবস্থান প্রমাণ করে যে, অভিজ্ঞতার চেয়েও এখন কাগজের ডিগ্রি বা সার্টিফিকেটের গুরুত্ব আইনের চোখে অনেক বেশি।
সুপ্রিম কোর্টের ১লা সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর নির্দেশিকা ও অনুচ্ছেদ ১৪২:
গতকালের সংসদীয় বিবৃতিতে ১লা সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের সেই যুগান্তকারী রায়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আদালত সংবিধানের Article 142-এর বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইন-সার্ভিস শিক্ষকদের জন্য যে চূড়ান্ত গাইডলাইন ঠিক করে দিয়েছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ৩১ আগস্ট ২০২৭-এর চূড়ান্ত সময়সীমা: যাঁদের চাকরির মেয়াদ ৫ বছরের বেশি অবশিষ্ট আছে, তাঁদের জন্য আদালত মাত্র ২ বছর সময় দিয়েছে। রায়ের দিন থেকে হিসেব করলে ২০২৭ সালের ৩১শে আগস্টের মধ্যে তাঁদের অবশ্যই টেট উত্তীর্ণ হতে হবে। সংসদে জানানো হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি রক্ষা করা এবং বেতন প্রদান করা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
২. অবসরপ্রান্ত শিক্ষকদের জন্য সামান্য স্বস্তি: যাঁদের অবসরের সময় মাত্র ৫ বছর বা তার কম বাকি আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে মানবিক কারণে টেট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা টেট পাস না করেই অবসর গ্রহণ করতে পারবেন। তবে এই ছাড় কেবল বর্তমান পদে আসীন থাকার জন্যই প্রযোজ্য।
৩. পদোন্নতির রুদ্ধ দ্বার (Promotion Barrier): সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদটি হলো পদোন্নতি নিয়ে। গতকালের সংসদীয় উত্তরে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, আপনি যতই অভিজ্ঞ হোন না কেন, টেট উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কর্মরত শিক্ষকই পদোন্নতির জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না। অর্থাৎ, যারা প্রধান শিক্ষক বা উচ্চতর পদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, টেট সার্টিফিকেট ছাড়া সেই স্বপ্ন এখন চিরতরে ধূলিসাৎ।
রাজ্য সরকারের অবস্থান ও আইনি ব্যর্থতা:
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এই রায়ের গুরুত্ব বুঝে মাননীয় সুপ্রিম কোর্টে একটি 'Review Petition' বা পুনর্বিবেচনার আবেদন দাখিল করেছিল। রাজ্য সরকার দাবি করেছিল যে, বহু শিক্ষক যারা কয়েক দশক ধরে পড়াচ্ছেন, তাঁদের পক্ষে বর্তমান বয়সে নতুন করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু মহামান্য আদালত সেই আর্জি খারিজ করে দিয়েছেন। লোকসভায় গতকাল কেন্দ্র এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর কেন্দ্র বা রাজ্য কারও হাতেই নিয়ম শিথিল করার ক্ষমতা আর অবশিষ্ট নেই।
সামাজিক ও মানসিক প্রভাব: শিক্ষক পরিবারের হাহাকার:
এই নির্দেশের ফলে সারা দেশের প্রায় ২০ লক্ষ এবং পশ্চিমবঙ্গের কয়েক লক্ষ শিক্ষক পরিবার মহাবিপাকে পড়েছেন। অনেকেই তাঁদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। ডায়মন্ড হারবার অঞ্চলের অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন, "আমরা যখন চাকরিতে এসেছিলাম তখন সরকার আমাদের বলেনি যে ২০ বছর পর আবার পরীক্ষা দিতে হবে। আজ মাঝবয়সে এসে সংসার সামলে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেওয়া আমাদের জন্য পাহাড় ডিঙানোর সমান।"
বলা হচ্ছে, 'আর কোনো আন্দোলনে কাজ হবে না।' আইনি পথ এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা স্লোগান এখন আর চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। হয় টেট পাস করুন, নতুবা পেশাগত জীবনের সমাপ্তি মেনে নিন— এই রূঢ় সত্যটিই গতকাল সংসদের অলিন্দে ধ্বনিত হয়েছে।
ভবিষ্যতের দিশা: টেট পরীক্ষার প্রস্তুতিই কি একমাত্র পথ?
গত রবিবার কেন্দ্রীয় টেট (CTET) অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং চলতি বছরের শেষ দিকে আরও একবার এই পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। রাজ্য সরকারের টেট হতে পারে নির্বাচনের পরেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষকদের আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
দ্রুত পড়াশোনা শুরু করা: যেহেতু ২০২৭ সালের আগস্টের পর বেতন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, তাই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উচিত মানসিকভাবে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
বিভাগীয় প্রশিক্ষণ: এনসিটিই-র গাইডলাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্রিজ কোর্স বা ডিপ্লোমা থাকলে তা সম্পন্ন করে রাখা।
ইউনিফর্ম ন্যাশনাল পলিসির আশা ত্যাগ করা: গতকালের সংসদীয় উত্তরের পর এটি পরিষ্কার যে কেন্দ্রীয় সরকার কোনোভাবেই টেট ইস্যুতে পিছু হটবে না।
উপসংহার: যখন সময় কথা বলে:
সংসদ এবং সুপ্রিম কোর্ট— দেশের দুই সর্বোচ্চ স্তম্ভ আজ একই সুরে কথা বলছে। যখন আইনের শাসন অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন লড়াইটা হয়ে ওঠে অস্তিত্ব রক্ষার। পদাতিক বাংলা-র পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, ৩১ আগস্ট ২০২৭-এর সেই ডেডলাইন আসলে প্রতিটি শিক্ষক পরিবারের জন্য একটি অন্তিম ঘণ্টা। যারা এই সময়কে অবহেলা করবেন, তাঁদের পেশাগত জীবনে অন্ধকার নেমে আসা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
শিক্ষামন্ত্রীর সেই 'শেষ উত্তর' সত্যিই লক্ষ লক্ষ শিক্ষক পরিবারের সাজানো সংসারকে 'শেষ' করার উপক্রম করেছে। এখন দেখার, এই ধ্বংসের মুষল থেকে বাঁচতে শিক্ষক সমাজ কতটা সফলভাবে পরীক্ষার লড়াইয়ে উত্তীর্ণ হতে পারে। পদাতিক বাংলা সব সময় শিক্ষক সমাজের পাশে আছে এবং প্রতিটি প্রশাসনিক খবরের ওপর কড়া নজর রাখছে।