📢 Telegram-এ যুক্ত হন

পদাতিক বাংলা

বাংলা ভাষার প্রিয় কন্টেন্টের ঠিকানা

চক্ষুদানের আইন জানে না পুলিশ? অজ্ঞতায় সমাজসেবীকে 'চোর' সাজালো সমাজ ও প্রশাসন!

চক্ষুদানের আইন জানে না পুলিশ? অজ্ঞতায় সমাজসেবীকে 'চোর' সাজালো সমাজ ও প্রশাসন!

অন্ধকার যখন প্রশাসনের মজ্জায়: কৃষ্ণনগরের অঙ্গদান বিতর্ক কি আধুনিক সমাজকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিল?


ভূমিকা: সভ্যতার এক নগ্ন পরিহাস একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে মহাকাশ গবেষণা—সবক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের জয়গান গাইছি, ঠিক তখনই আমাদের সমাজ কাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ অন্ধকার নগ্নভাবে বেরিয়ে এল নদিয়ার কৃষ্ণনগরে। মরণোত্তর চক্ষুদান বা অঙ্গদান হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন এক আশীর্বাদ, যা মৃত্যুর পরেও একজন মানুষকে অন্যের জীবনের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু সেই মহান ব্রতকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণনগরের কালিরহাট সেনপুর এলাকায় যে নজিরবিহীন ঘটনার অবতারণা হলো, তা কেবল একটি শোকাতুর পরিবারের অপমান নয়, বরং আধুনিক ভারতের মানবিক ও বৈজ্ঞানিক চেতনার কপালে এক কলঙ্কজনক তিলক। একজন একনিষ্ঠ সমাজসেবীকে যে কদর্যভাবে 'অঙ্গ পাচারকারী' হিসেবে সমাজ ও প্রশাসনের একাংশ চিহ্নিত করল, তা প্রমাণ করে যে আমরা এখনো মধ্যযুগীয় বর্বরতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি।


ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার চরম নজির ঘটনার সূত্রপাত রাবিয়া বিবির মৃত্যুতে। তাঁর সন্তান আমির চাঁদ শেখ একজন পরিচিত সমাজকর্মী। মায়ের দীর্ঘদিনের ইচ্ছে এবং আইনি নথিপত্র মেনে তিনি মৃত্যুর পর তাঁর মায়ের চক্ষুদান (কর্নিয়া সংগ্রহ) করার সিদ্ধান্ত নেন। একটি স্বীকৃত সংস্থার মেডিকেল টিম এসে যখন সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, তখনই প্রতিবেশী এবং স্থানীয় মানুষের একটি অংশ গুজব ছড়াতে শুরু করে যে, মৃতার অঙ্গ 'বিক্রি' করে দেওয়া হচ্ছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের মধ্যে কুসংস্কার বা অজ্ঞতা থাকতে পারে, কিন্তু আইনের রক্ষক পুলিশের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল সেই উন্মত্ত জনতাকে শান্ত করা এবং প্রকৃত তথ্য যাচাই করা। কিন্তু কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার পুলিশ এখানে চরম অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। তারা কোনো প্রাথমিক তদন্ত বা মেডিকেল টিমের বৈধতা যাচাই না করেই কেবল জনরোষের চাপে পড়ে আমির চাঁদ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে। The Transplantation of Human Organs and Tissues Act, 1994 অনুযায়ী অঙ্গদানের একটি নির্দিষ্ট এবং সুরক্ষিত আইনি কাঠামো ভারতে বিদ্যমান। পুলিশ যদি সেই আইনের নূন্যতম জ্ঞান রাখত, তবে একজন শোকাতুর সন্তানকে এভাবে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো না। পুলিশের এই 'অশিক্ষিত' আচরণ পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে তলানিতে ঠেকিয়েছে।


অঙ্গদান আন্দোলনে এক ভয়াবহ অশনি সংকেত এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব অত্যন্ত বিধ্বংসী। অঙ্গদান কোনো সাধারণ দান নয়; এটি একটি নিরন্তর বিপ্লব। ভারতে যেখানে লক্ষ লক্ষ দৃষ্টিহীন মানুষ কর্নিয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন, সেখানে এই ধরণের ঘটনা এক ভয়াবহ নেতিবাচক বার্তা বহন করে নিয়ে এল।


১. সম্ভাব্য অঙ্গদাতাদের মনে ত্রাস ও অনীহা: রাবিয়া বিবির পরিবারের ওপর যে ধরণের সামাজিক ও প্রশাসনিক লাঞ্ছনা নেমে এসেছে, তা দেখে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে মরণোত্তর অঙ্গদানের কথা ভাবতেও ভয় পাবেন। যাঁরা ইতিপূর্বে অঙ্গদানের অঙ্গীকার করেছেন, তাঁরা এখন ভাববেন যে তাঁদের সৎকারের আগে যদি তাঁদের পরিবারকে পুলিশের হয়রানি এবং প্রতিবেশীদের গঞ্জনা সইতে হয়, তবে এই মহৎ কাজের প্রয়োজন কী? এই আতঙ্ক অঙ্গদান আন্দোলনকে অন্তত বিশ বছর পিছিয়ে দিল।


২. সমাজসেবীদের নৈতিক পরাজয়: আমির চাঁদ শেখের মতো সমাজকর্মীরা সমাজের প্রতিটি স্তরে বিজ্ঞানচেতনা এবং মানবিকতার প্রচার করেন। কিন্তু যখন রাষ্ট্র স্বয়ং তাঁদের সুরক্ষা দেওয়ার বদলে 'চোর' বা 'পাচারকারী' তকমা দিয়ে কারাগারে পাঠায়, তখন সেই লড়াইয়ের নৈতিক জোর কমে যায়। একজন সৎ মানুষকে যখন জনসমক্ষে অসম্মান করা হয়, তখন সমাজসেবামূলক কাজের উৎসাহই হারিয়ে যায়।


৩. চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরাজয় ও ভীতি: অঙ্গ সংগ্রহের জন্য যখন কোনো মেডিকেল টিম কোনো জনবসতিপূর্ণ এলাকায় যাবে, তখন এই ঘটনার ছায়া তাঁদের তাড়া করবে। চিকিৎসকরা এখন থেকে এই ধরণের সংবেদনশীল কাজে অংশ নিতে ভয় পাবেন, যদি না প্রশাসন তাঁদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হলো সেই মুমূর্ষু রোগীদের, যাঁরা একটি অঙ্গের অপেক্ষায় মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন।


সামাজিক অবক্ষয় ও কুসংস্কারের থাবা এই ঘটনায় সমাজের এক কদর্য রূপ ফুটে উঠেছে। বিজ্ঞানচেতনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে কত সামান্য প্রবেশ করেছে, তা গুজব ছড়ানোর গতি দেখলেই বোঝা যায়। 'কিডনি চুরি' বা 'অঙ্গ পাচার'-এর মতো ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে একজন মানুষের মৃতদেহ নিয়ে যে ধরণের উন্মাদনা দেখা গেল, তা আধুনিক সমাজের জন্য লজ্জাজনক। সমাজ যখন কুসংস্কারের চশমা পরে থাকে, তখন সত্যকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আর যখন সেই অন্ধকারের সঙ্গী হয় পুলিশ প্রশাসন, তখন সাধারণ মানুষের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না।


আইনি বিশ্লেষণ ও প্রশাসনের দায়বদ্ধতা ভারতের আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি মরণোত্তর অঙ্গদানের শংসাপত্র বহন করেন অথবা নিকটাত্মীয়রা যদি সম্মতি দেন, তবে সেটি সম্পূর্ণ বৈধ। পুলিশ কেন সেই নথি খতিয়ে দেখার জন্য সামান্য সময় নিল না? কেন ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের আগেই তাঁদের হাজতে ঢোকানো হলো? পুলিশের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, স্পর্শকাতর সামাজিক বিষয়ে তাদের কোনো নূন্যতম প্রশিক্ষণ নেই।


উপসংহার: আলোর মশাল কি তবে নিভে যাবে? কৃষ্ণনগরের এই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, আইনের শাসনের চেয়ে এখনো গুজবের শাসন অনেক বেশি শক্তিশালী। যদি অবিলম্বে এই ভুল সংশোধন না করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ভারতের অঙ্গদান আন্দোলন এক অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যাবে। পদাতিক বাংলা মনে করে, আজ শুধু আমির চাঁদ শেখকে অপমান করা হয়নি, অপমান করা হয়েছে মানবিকতাকে এবং বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে। এই মিথ্যে কলঙ্ক মোচনের দায়িত্ব এখন প্রশাসনকেই নিতে হবে। অন্যথায়, সমাজসেবার পরিবর্তে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজদ্রোহিতাই এই দেশে শ্রেষ্ঠ আসন পাবে। আজ সময় এসেছে আমাদের রুখে দাঁড়ানোর, অশিক্ষার বিরুদ্ধে শিক্ষার এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর লড়াই জারি রাখার।

📢 এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর আগে পেতে

👉 আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত হোন ⚠️ সম্পূর্ণ খবর শুধুমাত্র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়

📢 গুরুত্বপূর্ণ খবর মিস করবেন না!

এই ধরনের খবরের আপডেট আগে জানতে আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত থাকুন

👉 Telegram-এ যুক্ত হোন
⚠️ সম্পূর্ণ খবর শুধুমাত্র ওয়েবসাইটে

লোড হচ্ছে...