তেহরান/মাশহাদ: লোহার গরাদের ওপাশে আরও ছয়টি দীর্ঘ বছর। অন্ধকার প্রকোষ্ঠের দেয়ালগুলো যখন কথা বলতে চায়, তখন তারা সম্ভবত নার্গেস মোহাম্মদীর নাম জপ করে। গত শনিবার ইরানের এক বিপ্লবী আদালত ২০২৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এবং নির্ভীক মানবাধিকার কর্মী নার্গেস মোহাম্মদীকে আরও ছয় বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। আইনজীবী মোস্তফা নিলি এক্সে (সাবেক টুইটার) এই রায়ের কথা নিশ্চিত করেছেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং এক গভীর হাহাকারের সৃষ্টি করেছে। এই রায় কেবল একজন ব্যক্তির ওপর দণ্ড নয়, বরং এটি একটি জাতির স্বাধীনতার আকুতিকে স্তব্ধ করার এক মরিয়া প্রচেষ্টা।
অন্ধকারের নতুন পরিচ্ছেদ: রায়ের নেপথ্যে
ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের একটি বিশেষ বিপ্লবী আদালত এই রায় ঘোষণা করে। আদালতের রায়ে মোহাম্মদীকে 'রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার' এবং 'জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে গোপন আঁতাত'-এর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে যারা ইরানের রাজনৈতিক ও বিচারিক ব্যবস্থার কঠোরতা সম্পর্কে অবগত, তারা জানেন যে এই শব্দবন্ধগুলো আসলে ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র মাত্র।
নতুন এই সাজার তালিকায় কেবল কারাবাসই নেই, রয়েছে অত্যন্ত কঠিন সব শর্ত। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাকে দুই বছরের জন্য 'খোসফ' নামক একটি অত্যন্ত প্রত্যন্ত এবং জনবিচ্ছিন্ন অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কারামুক্তির পর আগামী দুই বছর তার ওপর বিদেশ ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের সদস্য হওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আইনজীবী নিলি জানিয়েছেন, নার্গেস মোহাম্মদীর বিরুদ্ধে পূর্বের পেন্ডিং থাকা মামলাগুলোকেও এই রায়ের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে তার মোট কারাবাসের মেয়াদ এক অমানবিক স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে।
লড়াইয়ের নাম নার্গেস মোহাম্মদী: এক অবিরাম সংগ্রাম
নার্গেস মোহাম্মদী কেবল একজন অ্যাক্টিভিস্ট নন; তিনি এখন ইরানের নিপীড়িত মানুষের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। গত কয়েক দশক ধরে তিনি ইরানের 'ডিফেন্ডারস অফ হিউম্যান রাইটস সেন্টার'-এর উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন, যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আরেক নোবেলজয়ী শিরিন এবাদি। সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে রাজপথের আন্দোলন—সবখানেই নার্গেসের উপস্থিতি ছিল শাসকগোষ্ঠীর জন্য অস্বস্তিকর।
তার অপরাধ কী ছিল? তিনি নারীদের ওপর বাধ্যতামূলক হিজাব আইনের প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি ইরানের কুখ্যাত কারাগারগুলোতে বন্দীদের ওপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনের কথা বিশ্বকে জানিয়েছিলেন। তিনি মৃত্যুদণ্ডের মতো নিষ্ঠুর প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এই প্রতিবাদের মূল্য তাকে দিতে হয়েছে বারবার। এখন পর্যন্ত তাকে ১৩ বার গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে তাকে মোট ৩১ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫৪টি বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি সাজা তাকে আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং একটি খালি চেয়ার
২০২৩ সাল ছিল নার্গেস মোহাম্মদীর জীবনের এক অনন্য মাইলফলক। কারাবন্দী অবস্থায় তিনি যখন নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন, তখন নরওয়ের অসলোতে তার জন্য বরাদ্দ করা চেয়ারটি খালি পড়ে ছিল। তার পরিবর্তে তার ১৭ বছর বয়সী যমজ সন্তান—কিয়ানা এবং আলী—মায়ের পক্ষ থেকে সেই সম্মান গ্রহণ করেছিল। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল নার্গেসের সেই কালজয়ী বার্তা: "আমি একটি কারাগারের উঁচু, ঠান্ডা দেয়ালের আড়াল থেকে এই বার্তাটি লিখছি। ইরানের জনগণ, অধ্যবসায়ের সাথে, দমন-পীড়ন ও কর্তৃত্ববাদকে জয় করবে।" সেই মুহূর্তে বিশ্ববাসী দেখেছিল যে, একজন মা তার সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও কীভাবে একটি পুরো জাতির মা হয়ে উঠেছেন। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বারংবার তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ইরান সরকারকে অনুরোধ করা হলেও, তেহরান একে 'অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ' বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' আন্দোলনের মশাল
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যখন ইরানজুড়ে 'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' (Woman, Life, Freedom) স্লোগানে রাজপথ উত্তাল হয়েছিল, নার্গেস মোহাম্মদী তখন কারাবন্দী থেকেও সেই আন্দোলনের নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেছিলেন। কারাগারের ভেতরে থেকেই তিনি চিঠি লিখে এবং বার্তা পাঠিয়ে নারীদের উজ্জীবিত করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন যে, শরীরের ওপর শিকল পরানো গেলেও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা অসম্ভব।
বর্তমান সরকার নার্গেসকে নিয়ে এতটাই ভীত যে, তারা তাকে একে একে নতুন সব সাজা দিচ্ছে যাতে তিনি কোনোভাবেই জনসমক্ষে আসতে না পারেন। গত জানুয়ারি মাসেই তাকে আরও ১৫ মাসের সাজা দেওয়া হয়েছিল কেবল কারাগার থেকে বার্তা পাঠানোর অপরাধে। এবারের ৬ বছরের সাজা সেই ধারাবাহিক দমননীতিরই অংশ।
ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ও অনশন: মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
নতুন এই রায়ের সময় নার্গেস মোহাম্মদী এক কঠিন শারীরিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি কারাগারে পুনরায় অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। তার পরিবার জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের কারাবাস, সুচিকিৎসার অভাব এবং বারবার হার্ট অ্যাটাকের ফলে তার হার্ট এবং ফুসফুস অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত। সম্প্রতি তার পা থেকে একটি টিউমার অপসারণ করা হয়েছে, যা নিয়ে চিকিৎসকরা এখনও আশঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাকে যথাযথ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। বরং তাকে কারাগারের একটি ছোট প্রকোষ্ঠে আটকে রেখে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তবুও নার্গেস তার অনশন ভাঙতে রাজি হননি। তার এই লড়াই এখন কেবল তার নিজের জন্য নয়, বরং এটি ইরানের প্রতিটি রাজনৈতিক বন্দীর অধিকার আদায়ের লড়াই।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: বিশ্ববিবেকের কাছে প্রশ্ন
মোহাম্মদীর এই নতুন সাজার খবর বিশ্বমঞ্চে এক তীব্র বজ্রপাতের মতো আঘাত হেনেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে 'মানবাধিকারের চরম অবমাননা' বলে নিন্দা জানিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরান সরকার নার্গেস মোহাম্মদীকে ভয় পায় বলেই তাকে এভাবে জেলের ভেতরেই শেষ করে দিতে চায়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল থেকেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে। কেবল নিন্দা প্রস্তাব পাস করেই কি তাদের দায়িত্ব শেষ? ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি না করলে নার্গেসের মতো হাজারো বন্দীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। পদাতিক বাংলা মনে করে, বিশ্ববিবেকের এই মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।
উপসংহার: দেয়াল কি সত্যকে রুখতে পারে?
পদাতিক বাংলা-র সম্পাদকীয় দৃষ্টিতে, নার্গেস মোহাম্মদীর এই ছয় বছরের নতুন কারাদণ্ড আসলে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। যারা বন্দুক আর কারাগারের মাধ্যমে শাসন করতে চায়, তারা সবসময়ই সত্যকে ভয় পায়। নার্গেস মোহাম্মদী আজ হয়তো এভিন বা মাশহাদের নির্জন কারাকক্ষে বন্দী, কিন্তু তার আদর্শ আজ ইরানের প্রতিটি তরুণীর চোখে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে জ্বলছে।
ছয় বছরের কারাদণ্ড হয়তো তার ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে সময় কেড়ে নেবে, কিন্তু তার জ্বালানো প্রতিবাদের শিখা নিভিয়ে দেওয়ার শক্তি কোনো আদালতের নেই। এই হাহাকার কেবল এক নোবেলজয়ীর জন্য নয়, এটি মানবতার জয়গানের জন্য। ইতিহাস সাক্ষী আছে—অত্যাচারীর সিংহাসন একদিন ধুলোয় মিশে যায়, কিন্তু নার্গেস মোহাম্মদীদের মতো মানুষের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকে।