📢 Telegram-এ যুক্ত হন

পদাতিক বাংলা

বাংলা ভাষার প্রিয় কন্টেন্টের ঠিকানা

বিএলও ডিউটির টেনশন না কি স্লো পয়জন: হরিহরপাড়ার শিক্ষিকার অকাল প্রয়াণে কার গাফিলতি?

বিএলও ডিউটির টেনশন না কি স্লো পয়জন: হরিহরপাড়ার শিক্ষিকার অকাল প্রয়াণে কার গাফিলতি?

ভূমিকা ও ঘটনার ঘনঘটা: মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়া। শান্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে সেখানকার বাতাস এক বিষণ্ণতায় ভারী হয়ে আছে। কারণটা কোনো রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়, বরং একজন ৫৮ বছর বয়সী আদর্শ শিক্ষিকার করুণ মৃত্যু। শ্রীপুর নামুপাড়া শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষিকা মায়া মুখোপাধ্যায় আর নেই। শুক্রবার সকালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু এই মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘশ্বাস আর একরাশ ‘মানসিক যন্ত্রণা’। এসআইআর (SIR) আবহে শ্রীপুর ২৫১ নম্বর বুথের বিএলও (BLO) বা বুথ লেভেল অফিসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তিনি যেভাবে পিষ্ট হয়েছেন, তা আধুনিক সরকারি কর্মপদ্ধতির অমানবিক দিকটাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। পরিবার বলছে, এটা কেবল মৃত্যু নয়, এটা সিস্টেমের চাপে এক প্রকার ‘স্লো পয়জন’।


বিএলও ডিউটির অন্ধকার দিক ও মায়া দেবীর সংগ্রাম: একজন বিএলও-র কাজ বাইরে থেকে দেখতে কেবল ‘তালিকা সংশোধন’ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে অন্তহীন টেনশন। মায়া মুখোপাধ্যায় বিএলও হতে চাননি। ৫৮ বছর বয়স, শরীরে বাসা বেঁধেছে একাধিক বয়সজনিত রোগ—এ অবস্থায় তিনি চেয়েছিলেন পঠন-পাঠনেই নিবদ্ধ থাকতে। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশ বা ‘অর্ডার’ ছিল অলঙ্ঘনীয়। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে একের পর এক শুনানি, ভোটারদের নাম-তালিকা তৈরি করা, তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই করা এবং নির্দিষ্ট ‘ডেডলাইন’-এর মধ্যে তা জমা দেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়াটি তাঁর মতো একজন সিনিয়র মানুষের কাছে মেন্টাল টর্চার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজকের দিনে যেখানে সবকিছু ডিজিটাল হচ্ছে, সেখানে এই বয়সে এসে নতুন প্রযুক্তি আর অ্যাপের জটিলতা সামলানো ছিল তাঁর কাছে এক পাহাড়প্রমাণ বাধা।


আতঙ্কের অন্য নাম 'ভোটার লিস্ট' সংশোধন: মায়া দেবীর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে এক ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে। মায়া দেবী সবসময় এক অদ্ভুত আতঙ্কে ভুগতেন। তাঁর ভয় ছিল, ভোটার তালিকা থেকে যদি কারো নাম ভুলবশত বাদ পড়ে যায়, তবে গ্রামের মানুষ তাঁর বাড়িতে চড়াও হতে পারে। আজকের দিনে ভোটার কার্ডের সাথে আধার বা অন্যান্য পরিচয়পত্রের সংযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এই কাজ করতে গিয়ে কোনো ভুল হলে জনরোষের মুখে পড়ার যে ভয়, তা তাঁকে দিনরাত অস্থির করে রাখত। গ্রামবাসীদের সাথে সরাসরি ডিল করতে গিয়ে যে সোশ্যাল প্রেসার তৈরি হয়, তা সামলানোর মতো মানসিক অবস্থা তাঁর ছিল না। দিনরাত কেবল ভোটারদের ডেটা আর ফরম জমা দেওয়ার চিন্তায় তাঁর রক্তচাপ বাড়ছিল প্রতিনিয়ত।


বিএলও সিস্টেমের বিবর্তন ও বর্তমান সঙ্কট: নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুদ্ধিকরণের জন্য বিএলও নিয়োগের প্রথা অনেক পুরোনো। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই কাজের ধরন বদলে গেছে। এখন কেবল খাতায় কলমে কাজ হয় না, মোবাইল অ্যাপ (BLO App) ব্যবহার করে রিয়েল-টাইম ডেটা পাঠাতে হয়। একজন ৫৮ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষিকা, যিনি সারা জীবন চক-ডাস্টার নিয়ে কাটিয়েছেন, তাঁর পক্ষে এই র‍্যাপিড চেঞ্জ বা দ্রুত পরিবর্তন গ্রহণ করা কঠিন। অথচ প্রশাসন থেকে তাঁদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং বা মানসিক সাপোর্ট দেওয়া হয় না। বরং দেওয়া হয় কেবল ‘টার্গেট’ এবং শোকজ করার হুমকি। এই সিস্টেমের জাঁতাকলে পড়ে মায়া দেবীর মতো কর্মীরা নিজেদের সরকারি দপ্তরের একজন সাধারণ ‘মেশিন’ মনে করতে শুরু করেন, যেখানে আবেগের কোনো স্থান নেই।


প্রশাসনের গাফিলতি না কি পরিকল্পনাহীনতা: পরিবারের দাবি অনুযায়ী, মায়া মুখোপাধ্যায় বারবার প্রশাসনের কাছে তাঁর শারীরিক অক্ষমতার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসন কি তা কানে নিয়েছে? কেন একজন অসুস্থ এবং অবসরের দোরগোড়ায় থাকা শিক্ষিকাকে এমন স্ট্রেসফুল ডিউটিতে বাধ্য করা হলো? প্রশাসনের এই ‘একগুঁয়েমি’ আজ বড়সড় প্রশ্নের মুখে। যদি তাঁর শরীর সায় না দেয়, তবে বিকল্প ব্যবস্থা কেন করা হলো না? সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই ছাড় পাওয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় নিচুতলার আধিকারিকদের অসহযোগিতা। এই যে প্রশাসনের নির্দেশ পালনের দায়বদ্ধতা, তা কি একজন মানুষের প্রাণের চেয়েও বড়?


রাজনৈতিক তরজা ও এসআইআর বিতর্ক: মায়া দেবীর মৃত্যুকে ঘিরে হরিহরপাড়ার রাজনীতি এখন সরগরম। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অদূরদর্শী পরিকল্পনার ফলেই এই বিপর্যয়। এসআইআর-এর নামে বিএলও-দের ওপর যে পরিমাণ কাজের বোঝা চাপানো হয়েছে, তাতে কর্মীরা দিশেহারা। অভিযোগ উঠছে, সারা দেশে এই প্রক্রিয়ার চাপে পড়ে ইতিপূর্বেও শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ চাপের চোটে সুইসাইড করেছেন, কেউ বা মায়া দেবীর মতো হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন। উল্টোদিকে বিরোধীদের দাবি, রাজ্য স্তরেও প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় গলদ রয়েছে। এই ব্লেম গেম বা কাদা ছোড়াছুড়ি চলতেই থাকবে, কিন্তু যে মানুষটা চলে গেল, তাঁকে কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব?


শিক্ষকদের ওপর অ-শিক্ষামূলক কাজের প্রভাব: পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষকদের ওপর বর্তমানে কাজের যে চাপ, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলছে। মিড-ডে মিলের চালের হিসাব থেকে শুরু করে জনগণনা বা ভোটার লিস্টের কাজ—সবকিছুতেই শিক্ষকদের ডাক পড়ে। এতে একদিকে যেমন পঠন-পাঠন শিকেয় উঠছে, অন্যদিকে শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি হচ্ছে। মায়া মুখোপাধ্যায়ের মতো শিক্ষিকারা যখন শ্রেণিকক্ষে শিশুদের পড়ানোর বদলে ভোটার লিস্টের ‘প্যাঁচ’ নিয়ে দিন কাটান, তখন বুঝতে হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো কতটা রুগ্ন হয়ে পড়েছে। কাজের এই ডাইভার্সিফিকেশন বা বহুমুখিতা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।


বিএলও-দের সুরক্ষায় প্রয়োজন নতুন নীতিমালা: এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে বিএলও-দের জন্য নতুন প্রটোকল তৈরি করা।

বয়সের মাপকাঠি: ৫৫ বছরের বেশি বয়সী কর্মীদের এই ধরনের ফিল্ড ডিউটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত।

মেডিক্যাল চেকআপ: দায়িত্ব দেওয়ার আগে কর্মীদের শারীরিক সুস্থতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক হওয়া দরকার।

প্রযুক্তিগত সহায়তা: প্রতিটি বুথে বিএলও-র সাথে একজন দক্ষ ডেটা এন্ট্রি অপারেটর বা ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা উচিত যাতে মানসিক চাপ কমে।

কাউন্সেলিং: যে কর্মীরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করছেন, তাঁদের জন্য মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।


মায়া মুখোপাধ্যায়ের পরিবারের হাহাকার: শুক্রবার যখন মায়া দেবী অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন পরিবারের সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়াটা হয়তো চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একটি শারীরিক ঘটনা, কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা দিনরাতের দুশ্চিন্তা আর প্রশাসনের হুকুমদারিই ছিল আসল কালপ্রিট। ভোটার তালিকা জমা দেওয়ার ডেডলাইন পার হয়ে যাবে কি না—এই ভাবনাই ছিল তাঁর শেষ চিন্তা। একজন শিক্ষিকার এমন মৃত্যু সমাজ মেনে নিতে পারছে না। হরিহরপাড়ার মানুষ আজ শোকস্তব্ধ, কিন্তু সেই শোকের আড়ালে ধিকিধিকি জ্বলছে ক্ষোভের আগুন।


শেষ কথা ও পদাতিক বাংলা-র আহ্বান: মায়া মুখোপাধ্যায়ের এই অকাল প্রয়াণ আমাদের সমাজ ও প্রশাসনের গালে একটি বড় চড়। আমরা কি এভাবেই দক্ষ কর্মীদের হারিয়ে ফেলব? সরকারি কাজ মানেই কি কেবল দাপ্তরিক নির্দেশ আর মানুষের লাশের মিছিল? পদাতিক বাংলা ব্লগের পক্ষ থেকে আমরা দাবি জানাই, মায়া মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুকে কেবল ‘হৃদ্‌রোগ’ বলে চালিয়ে না দিয়ে এর পেছনের প্রশাসনিক গাফিলতি খতিয়ে দেখা হোক। মৃতার পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং সম্মান জানানো হোক। সিস্টেমের এই ‘স্লো পয়জন’ বন্ধ না হলে আগামীতে আরও অনেক মায়া মুখোপাধ্যায়কে আমরা হারাব। সরকারি আধিকারিকদের মনে রাখা উচিত, নথিপত্রের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। মায়া দেবীর এই বলিদান যেন বৃথা না যায়, এটাই আমাদের প্রার্থনা।

📢 এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর আগে পেতে

👉 আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত হোন ⚠️ সম্পূর্ণ খবর শুধুমাত্র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়

📢 গুরুত্বপূর্ণ খবর মিস করবেন না!

এই ধরনের খবরের আপডেট আগে জানতে আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত থাকুন

👉 Telegram-এ যুক্ত হোন
⚠️ সম্পূর্ণ খবর শুধুমাত্র ওয়েবসাইটে

লোড হচ্ছে...