বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে সল্টলেকের রাজপথ বহু আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে। কখনো শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, কখনো আবার নার্সদের আন্দোলন—সেক্টর ফাইভ থেকে করুণাময়ী চত্বর বারবার রণক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে। কিন্তু শুক্রবারের দৃশ্যটি ছিল একেবারেই আলাদা। নীল-সাদা বা লাল পতাকার বদলে চারপাশ ছেয়ে গিয়েছিল গাঢ় বেগুনি রঙের শাড়িতে। হাজার হাজার আশা কর্মী (ASHA Workers) এদিন তাঁদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাস্তায় নেমেছিলেন। তবে এই আন্দোলনের গতিপথ বা Direction যেভাবে বদলে গেল, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছে। স্বাস্থ্য ভবন অভিযানের ডাক দিয়ে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ শেষমেশ গিয়ে আছড়ে পড়ল রাজ্য বিজেপির সদর দপ্তরের দরজায়। যেখানে খোদ রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে পড়তে হলো আশা কর্মীদের নজিরবিহীন ক্ষোভের মুখে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট: বঞ্চনা বনাম প্রতিশ্রুতির লড়াই:
আশা কর্মীদের এই দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের মূলে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক সংকট। গ্রামবাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সচল রাখতে যে মহিলারা দিনরাত এক করে দেন, তাঁদের মাসিক সাম্মানিক বা Honorarium বর্তমানে যে স্তরে রয়েছে, তা দিয়ে এই আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সংসার চালানো অসম্ভব। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বাজেটে অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য আশা কর্মীদের জন্য কিছু নতুন সুবিধা ঘোষণা করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে:
মাসিক ভাতার পরিমাণ ১০০০ টাকা বৃদ্ধি।
১৮০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি।
কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবারের জন্য ৫ লক্ষ টাকার এককালীন সাহায্য।
তবে এই ঘোষণাকে 'সমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা জল' বলে অভিহিত করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের মতে, রাজ্য সরকার কেবল নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এই ললিপপ ধরিয়ে দিয়েছে। তাঁদের মূল দাবি—স্থায়ী পদের মর্যাদা এবং কেন্দ্রীয় হারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন কাঠামো তৈরি করা। এই ক্ষোভ থেকেই শুরু হয় শুক্রবারের 'স্বাস্থ্য ভবন অভিযান'।
রণক্ষেত্র সল্টলেক: পুলিশের ব্যারিকেড ও উত্তাল পরিস্থিতি:
শুক্রবার সকাল থেকেই বিধাননগর পুলিশ সল্টলেকের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কড়া পাহারা বসিয়েছিল। করুণাময়ী থেকে স্বাস্থ্য ভবনের দিকে এগোতেই প্রথম বাধার মুখে পড়েন আশা কর্মীরা। ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করতেই শুরু হয় ধস্তাধস্তি। বহু মহিলা কর্মী পুলিশের ধাক্কায় রাস্তায় পড়ে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ যখন মরিয়া, ঠিক তখনই আন্দোলনকারীরা তাঁদের কৌশল বদল করেন। তাঁরা মূল রাস্তা ছেড়ে দিয়ে অলিগলি দিয়ে সল্টলেকে অবস্থিত বিজেপির রাজ্য দপ্তরের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে সেক্টর ফাইভের শান্ত পরিবেশ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে। 'আমাদের দাবি মানতে হবে', 'কেন্দ্র-রাজ্য ভাঁওতাবাজি চলবে না'—এই চিৎকারে কেঁপে ওঠে বিজেপির অফিস চত্বর।
শমীক ভট্টাচার্য বনাম আশা কর্মী: যখন গেরুয়া শিবিরে বিদ্রোহের আঁচ:
ঠিক যে সময় বিজেপি অফিসের সামনে বেগুনি শাড়ির সমুদ্র আছড়ে পড়েছে, তখনই সেখানে পৌঁছান রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। আন্দোলনকারীদের ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢোকা তাঁর পক্ষে কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কোনোক্রমে নিরাপত্তারক্ষীদের সহায়তায় তিনি যখন ভেতরে ঢোকেন, তখন চারপাশ থেকে শুরু হয় বিক্ষোভ।
বিজেপি নেতা যখন সাংবাদিকদের সামনে এসে রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করতে শুরু করেন এবং এই বাজেটকে 'প্রতারণার বাজেট' বলে আখ্যা দেন, ঠিক তখনই ঘটে ছন্দপতন। আন্দোলনরত মহিলারা সরাসরি শমীক ভট্টাচার্যের সামনেই কেন্দ্রের মোদী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। এক আশা কর্মী চিৎকার করে বলেন, "রাজ্য তো ১০০০ টাকা বাড়িয়েছে, প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য কী করেছেন? কেন প্রতি বছর কেন্দ্রীয় বাজেটে আমাদের কোনো কথা থাকে না?"
শমীক ভট্টাচার্য পরিস্থিতি সামলাতে বলেন, "প্রধানমন্ত্রী সব জানেন, নতুন সরকার এলে ব্যবস্থা হবে।" কিন্তু এই আশ্বাসে কাজ হয়নি। আন্দোলনকারীরা পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, "তাহলে কি কেবল ভোটের জন্যই আমাদের ব্যবহার করা হবে?" এই দৃশ্যটি ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সচরাচর বিজেপির অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এমন সরাসরি তোপ সচরাচর দেখা যায় না।
কেন্দ্রীয় অবহেলা বনাম রাজ্যের দায় এড়ানো:
আশা কর্মীদের এই সংকটের পেছনে একটি বড় কারণ হলো 'কেন্দ্র-রাজ্য দড়ি টানাটানি'। এটি আসলে একটি কেন্দ্রীয় প্রকল্প হলেও এর বাস্তবায়নের অনেকটা অংশ নির্ভর করে রাজ্যের ওপর।
কেন্দ্রীয় অবস্থান: কেন্দ্র মনে করে তারা যে ফান্ড দেয়, রাজ্য তা সঠিক খাতে খরচ করে না।
রাজ্যের অবস্থান: রাজ্য দাবি করে, কেন্দ্র টাকা আটকে রেখেছে বলেই কর্মীদের ভাতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
এই দুই বড় শক্তির চাপে মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছেন সেই সাধারণ আশা কর্মীরা। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "আমরা কোনো রাজনীতির ফুটবল হতে চাই না। আমাদের বলা হচ্ছে এটা কেন্দ্রীয় প্রজেক্ট, অথচ আমরা কাজ করছি রাজ্যের জন্য। যদি কেন্দ্রের প্রজেক্ট হয়, তবে কেন্দ্র কেন আমাদের স্থায়ী গ্রুপ-ডি কর্মীর মর্যাদা দিচ্ছে না?" এই যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন আজ কেবল বিজেপির নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
সমাজ ও অর্থনীতিতে আশা কর্মীদের অবদান:
১০০০ শব্দের এই নিবন্ধে আশা কর্মীদের কাজের গুরুত্ব আলোচনা না করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ইউনিসেফ থেকে শুরু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)—সবাই বারবার ভারতের 'আশা' মডেলের প্রশংসা করেছে।
টিকাকরণ: পোলিও থেকে শুরু করে কোভিড ভ্যাকসিন, প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন এই মহিলারা।
মাতৃস্বাস্থ্য: প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রসব পরবর্তী দেখাশোনা করার ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো বিকল্প নেই।
সচেতনতা: গ্রামীণ এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা এবং পুষ্টির বিষয়ে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করার প্রধান কারিগর হলেন তাঁরা।
অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের বিনিময়ে তাঁরা যে সাম্মানিক পান, তা একজন অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরির চেয়েও কম। এই অর্থনৈতিক বৈষম্যই আজ তাঁদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।
ভবিষ্যতের রূপরেখা: এই আন্দোলন কি জনমতের মোড় ঘোরাবে?
সল্টলেকের এই 'বেগুনি বিদ্রোহ' কেবল বেতন বাড়ানোর লড়াই নয়, এটি সম্মানের লড়াই। বিজেপি অফিসের সামনে যে বিক্ষোভ দেখা গেল, তা গেরুয়া শিবিরের জন্য বড় সতর্কবার্তা। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগঞ্জে বিজেপির যে শক্তঘাঁটি তৈরি হয়েছে, সেখানে আশা কর্মীদের একটি বিরাট প্রভাব রয়েছে। তাঁরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে নির্বাচনের অংক মেলাতে হিমশিম খেতে হবে বঙ্গ বিজেপিকে।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারকেও বুঝতে হবে যে কেবল ভাতা বাড়িয়ে এই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষোভ প্রশমিত করা সম্ভব নয়। মাতৃত্বকালীন ছুটি বা বিমার সুবিধা অবশ্যই ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু পেটের জ্বালা তাতে কমবে না। সল্টলেকের রাস্তায় পুলিশের লাঠির সামনে বুক পেতে দেওয়া মহিলারা আজ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁরা আর আপোষ করতে রাজি নন।
উপসংহার:
পদাতিক বাংলা-র বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, শুক্রবারের এই বিক্ষোভ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। এতদিন আন্দোলনের অভিমুখ কেবল নবান্ন বা স্বাস্থ্য ভবনের দিকে থাকলেও, এখন তা কেন্দ্রের দিকেও ঘুরতে শুরু করেছে। শমীক ভট্টাচার্যের সামনে আশা কর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশ আসলে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা সবার জন্য এক সতর্কঘণ্টা। যদি শীঘ্রই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার সম্মিলিতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছায়, তবে এই বেগুনি বিদ্রোহ আগামী দিনে আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে।