পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বাজেট ২০২৬: লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে কি বড় ধামাকা? ভোটের আগে মমতার মাস্টারস্ট্রোকে সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন হতে চলেছে। বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে পেশ হতে চলা এই অন্তর্বর্তী বাজেট বা 'ভোট অন অ্যাকাউন্ট' নিয়ে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। নবান্ন সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এবার এমন কিছু জনমোহিনী ঘোষণা করতে চলেছে, যা কার্যত বিরোধীদের নির্বাচনী রণকৌশলকে চাপে ফেলে দেবে। আজকের এই দীর্ঘ প্রতিবেদনে পদাতিক বাংলা বিশ্লেষণ করবে সেই সমস্ত দিক, যা আগামী কয়েক বছর বাংলার অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
১. লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: বাংলার নারীশক্তির নতুন দিগন্ত
তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্প কেবল একটি সামাজিক প্রকল্প নয়, এটি একটি বিপ্লব। বর্তমানে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা ১০০০ টাকা এবং তফশিলি জাতি ও উপজাতির মহিলারা ১২০০ টাকা করে সরাসরি ব্যাঙ্কে পাচ্ছেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বিশেষ বাজেটে শোনা যাচ্ছে এক চাঞ্চল্যকর পরিবর্তনের কথা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুদ্রাস্ফীতি এবং দৈনন্দিন বাজারদরের কথা মাথায় রেখে সরকার এই ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করে ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত করতে পারে। যদি সাধারণ শ্রেণির মহিলাদের ভাতা বাড়িয়ে ২০০০ টাকা করা হয়, তবে তা হবে ভারতের ইতিহাসে কোনো রাজ্যের পক্ষ থেকে নারীদের দেওয়া অন্যতম বড় আর্থিক সহায়তা। এটি কেবল ভোটের রাজনীতি নয়, বরং গ্রামীণ বাজারে নগদের জোগান বাড়িয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
২. সরকারি কর্মচারীদের ডিএ (DA) ও বেতন কমিশন জট
রাজ্য সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি হলো বকেয়া মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ। আদালতের রায় এবং বারবার আন্দোলনের জেরে রাজ্য সরকার কিছুটা চাপে থাকলেও, এবার নির্বাচনের আগে বড় কোনো ঘোষণা আসার সম্ভাবনা প্রবল। এবারের বাজেটে কি নতুন বেতন কমিশন (Pay Commission) গঠনের কোনো ইঙ্গিত মিলবে? নাকি ডিএ-র হার আরও ৫% বাড়িয়ে কেন্দ্রীয় হারের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হবে? সরকারি কর্মী পরিবারগুলোর কয়েক লক্ষ ভোটকে নিজেদের অনুকূলে রাখতে এই বাজেটে অর্থমন্ত্রী বড়সড় বরাদ্দ রাখতে পারেন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
৩. বেকারত্ব নিরসন ও কর্মসংস্থানের ব্লু-প্রিন্ট
এবারের বাজেটের অন্যতম মূল স্তম্ভ হতে চলেছে কর্মসংস্থান। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি (IT), লজিস্টিকস এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) বিভাগে প্রচুর কর্মসংস্থানের ঘোষণা আসতে পারে। সরকার হয়তো 'সিলিকন ভ্যালি' বা দেউচা-পাচামির মতো বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে নতুন দিশা দেখাবে। এ ছাড়াও স্টার্ট-আপ বা নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য 'ভবিষ্যৎ' ক্রেডিট কার্ডের পরিধি বাড়িয়ে লোনের সীমা ৫ লক্ষ টাকা থেকে ১০ লক্ষ টাকা করা হতে পারে। যারা স্বনির্ভর হতে চান, তাঁদের জন্য এটি একটি বিশাল সুযোগ।
৪. কৃষক বন্ধু ও কৃষি পরিকাঠামো
বাংলার অন্নদাতার জন্য সরকার সবসময়ই অগ্রগণ্য। 'কৃষক বন্ধু' প্রকল্পে ইতিমধ্যেই বছরে ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। এবারের বাজেটে ফসল বিমার প্রিমিয়াম পুরোটাই রাজ্য সরকার বহন করার ঘোষণা করতে পারে। পাশাপাশি হিমঘর বা কোল্ড স্টোরেজ তৈরির জন্য কৃষকদের বড় অংকের ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়া কমবে এবং কৃষকরা তাঁদের ফসলের সঠিক মূল্য পাবেন।
৫. স্বাস্থ্যসাথী ও সামাজিক বিমার আধুনিকীকরণ
'স্বাস্থ্যসাথী' কার্ড নিয়ে মাঝেমধ্যেই কিছু বেসরকারি হাসপাতালের অসহযোগিতার কথা শোনা যায়। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য দপ্তরের বরাদ্দ বাড়িয়ে সেই বকেয়া মেটানোর এবং পরিষেবাকে আরও মসৃণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসার ঊর্ধ্বসীমা ৫ লক্ষ থেকে বাড়িয়ে আরও কিছুটা করা হতে পারে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে সবার।
৬. পরিকাঠামো উন্নয়ন ও 'সবুজ সাথী'র নতুন রূপ
কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি—পুরো রাজ্য জুড়েই উড়ালপুল, এক্সপ্রেসওয়ে এবং নতুন মেট্রো রুটের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য বিপুল টাকা বরাদ্দ হতে চলেছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য কেবল সাইকেল নয়, উচ্চশিক্ষার জন্য ল্যাপটপ বা ট্যাবের বরাদ্দ আরও সহজলভ্য করার ঘোষণা আসতে পারে। উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলের উন্নয়নের জন্য বিশেষ আঞ্চলিক বাজেট বরাদ্দ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
৭. রাজস্ব আদায় ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
প্রশ্ন উঠতে পারে, এত টাকা আসবে কোথা থেকে? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জিডিপি (GSDP) বৃদ্ধির হার জাতীয় গড়ের তুলনায় যথেষ্ট ইতিবাচক। আবগারি শুল্ক এবং জিএসটি (GST) সংগ্রহ বাড়ায় রাজ্যের কোষাগারে কিছুটা স্থিতি এসেছে। তবে ঋণ ও সুদের বোঝা সামলে সরকার কতটা সফলভাবে এই বাজেট পেশ করবে, তা দেখার বিষয়।
উপসংহার
২০২৬ সালের এই বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি বাংলার উন্নয়নের একটি রোডম্যাপ। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সরকারের সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী কেমন বাজেট পেশ করেন, তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। বাংলার উন্নয়নের এই জয়যাত্রায় আপনিও শরিক হতে থাকুন।
সব আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন আমাদের অফিশিয়াল ব্লগ পদাতিক বাংলা।