📢 Telegram-এ যুক্ত হন

পদাতিক বাংলা

বাংলা ভাষার প্রিয় কন্টেন্টের ঠিকানা

কী ঘটেছিল ৩১ আগস্ট রাতে? নারাভানের ডায়েরি ও গালওয়ান রহস্যের প্রশ্নে বিদ্ধ রাজনাথ

কী ঘটেছিল ৩১ আগস্ট রাতে? নারাভানের ডায়েরি ও গালওয়ান রহস্যের প্রশ্নে বিদ্ধ রাজনাথ

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সীমান্ত নীতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝড় উঠেছে সংসদের ভেতরে ও বাইরে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংকে লক্ষ্য করে এক জোরালো অভিযোগ হেনেছেন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের ২৮তম সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানের (General MM Naravane) অপ্রকাশিত আত্মজীবনী 'ফোর স্টারস অফ ডেসটিনি' (Four Stars of Destiny)। এই বইটির কিছু অংশ যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, তা এখন বিরোধীদের হাতে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী 'অস্ত্র' হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ঘটনার প্রেক্ষাপট: হিমালয়ের কোলে ঘনিয়ে আসা যুদ্ধের ছায়া

২০২০ সালের জুন মাসে গালওয়ান উপত্যকায় ২০ জন ভারতীয় জওয়ানের আত্মত্যাগের পর ভারত ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই উত্তেজনার সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং চাঞ্চল্যকর মুহূর্তটি এসেছিল ৩১ আগস্টের রাতে। জেনারেল নারাভানের ডায়েরি অনুযায়ী, সেই রাতে পূর্ব লাদাখের প্যাংগং লেকের দক্ষিণ তীরে রেচিন লা (Rechin La) পাসে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যা আগে কখনো জনসমক্ষে আসেনি।

নারাভানে লিখেছেন, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) তাদের কয়েক ডজন ট্যাঙ্ক নিয়ে ভারতীয় অবস্থানের অত্যন্ত কাছাকাছি চলে আসে। পাহাড়ের চূড়ায় থাকা ভারতীয় জওয়ানরা এবং নিচে মোতায়েন করা ট্যাঙ্ক বাহিনী তখন কেবল একটি নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল। সেই মুহূর্তে সামান্যতম ভুল পদক্ষেপ বা একটি ট্রিগার টেপার অর্থ হতো দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ।

জেনারেল নারাভানে সেই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন যে, গ্রাউন্ডে থাকা কমান্ডাররা চূড়ান্ত নির্দেশের জন্য বারবার সদর দপ্তরে যোগাযোগ করছিলেন। এটি ছিল ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক অগ্নিপরীক্ষা।


নারাভানে কে? কেন তার কথা এত গুরুত্বপূর্ণ?

জেনারেল এম.এম. নারাভানে ছিলেন ভারতের ২৮তম সেনাপ্রধান। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে ছিলেন। তার চার দশকের বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনে তিনি উত্তর-পূর্ব ভারত, কাশ্মীর এবং শ্রীলঙ্কার শান্তি রক্ষা মিশনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

একজন সেনাপ্রধান যখন নিজের অভিজ্ঞতার কথা লেখেন, তখন তার ঐতিহাসিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। নারাভানে যখন ২০২০ সালের সংকটের কথা বলেন, তখন তা কোনো জল্পনা নয় বরং মাঠের বাস্তব চিত্র।

তার বই 'ফোর স্টারস অফ ডেসটিনি' মূলত তার স্মৃতিকথা, যেখানে তিনি কেবল সামরিক বিজয় নয়, বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দোদুল্যমানতাকেও তুলে ধরেছেন।


রাজনাথ সিংয়ের সেই ফোন এবং 'হট পটেটো' বিতর্ক

রাহুল গান্ধীর অভিযোগের মূল ভিত্তি হলো সেই রাতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দেওয়া উত্তর। রাহুল গান্ধী সংসদে দাবি করেন, সেনাপ্রধান নারাভানে যখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংকে ফোন করেন এবং স্পষ্ট নির্দেশনা চান, তখন রাজনাথ সিং তাৎক্ষণিক কোনো অপারেশনাল সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি।

রাত ১০:৩০ মিনিটে রাজনাথ সিং প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে আলোচনার পর সেনাপ্রধানকে ফোন করে বলেন— "জো উচিত সমঝোঁ ওহি করো" (যা উচিত মনে করো তাই করো)।

রাহুল গান্ধী এই শব্দবন্ধটিকে "দায় এড়ানো" (Running away from responsibility) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যখন দেশের সীমান্ত বিপন্ন এবং যুদ্ধের দামামা বাজছে, তখন প্রধানমন্ত্রী কেন দায়িত্ব নিয়ে স্পষ্ট আদেশ দিলেন না? নারাভানে তার বইতে এই পরিস্থিতিকে একটি "Hot Potato" (জ্বলন্ত কয়লা)-র সাথে তুলনা করেছেন।

এর অর্থ হলো, এমন একটি দায় যা কেউ নিজের হাতে রাখতে চায় না এবং অন্য কারো দিকে ঠেলে দিতে চায়। রাহুল গান্ধীর মতে, মোদী সরকার সেই রাতে সেনাপ্রধানের কাঁধে বন্দুক রেখে চালিয়েছিলেন যাতে কোনো বিপর্যয় ঘটলে তার দায় সেনাবাহিনীর ওপর চাপানো যায়।


বইটিতে আর কী কী তথ্য রয়েছে?

১. অগ্নিপথ প্রকল্প (Agnipath Scheme): নারাভানে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অগ্নিপথ স্কিমটি সেনাবাহিনীর জন্য একটি 'বোল্ট ফ্রম দ্য ব্লু' বা আকস্মিক বজ্রপাতের মতো ছিল।

২. বাফার জোন বিতর্ক: রাহুল গান্ধীর দাবি অনুযায়ী, গালওয়ানের পর ভারত এমন কিছু জমি হারিয়েছে যা এখন 'বাফার জোন' (Buffer Zone) হিসেবে পরিচিত।

৩. ইন্টেলিজেন্স ফেইলিওর: ২০২০ সালের শুরুতে চীনের লাল ফৌজ কীভাবে এত বড় পরিসরে লাদাখে ঢুকে পড়ল, তা নিয়ে গোয়েন্দা ব্যর্থতার দিকেও পরোক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে এই বইতে।


রাহুল গান্ধীর অভিযোগ: 'প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গিয়েছেন'

সংসদে রাহুল গান্ধী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজেকে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে দাবি করলেও আসল সংকটের সময় তিনি "পালিয়ে গিয়েছিলেন"

রাহুল বলেন, "নেতৃত্ব মানে হলো কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নারাভানেকে একাকী ছেড়ে দিয়েছিলেন।"

রাহুল গান্ধীর এই বক্তব্য সরকারকে প্রচণ্ড চাপে ফেলেছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যখন সংসদে এই বইয়ের উদ্ধৃতি দিতে বাধা দেন, তখন জনমনে প্রশ্ন আরও গভীর হয়— সরকার কি সত্যি কিছু লুকাতে চাইছে?


সরকারের পাল্টা যুক্তি: 'সেনাবাহিনীকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে'

বিজেপি সরকার এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাদের মতে, "যা উচিত মনে করো তাই করো" বলাটা সেনাপ্রধানের ওপর অগাধ বিশ্বাসের প্রতীক। সরকার একে 'অপারেশনাল ফ্রিডম' (Operational Freedom) হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তাদের যুক্তি হলো, সীমান্তে কী ঘটছে তা একজন সেনাপ্রধানই সেরা বোঝেন, তাই এসি রুমে বসে প্রধানমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পক্ষ থেকে সরাসরি আদেশ দেওয়া সামরিক কৌশলের পরিপন্থী হতে পারে।


উপসংহার: সত্য কি আড়ালে থাকবে?

পদাতিক বাংলা ব্লগের এই দীর্ঘ বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, জেনারেল নারাভানের ডায়েরি কেবল একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা নয়, বরং এটি ভারতের সীমান্ত ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

রাহুল গান্ধীর এই রাজনৈতিক আক্রমণ মোদী সরকারের স্বচ্ছতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ৩১ আগস্টের সেই রাতে ভারতীয় জওয়ানরা যে সাহসিকতা দেখিয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানার অধিকার দেশবাসীর আছে।

নারাভানের বইটি প্রকাশিত হলে হয়তো আমরা জানতে পারব— সেই রাতে রাজনাথ সিং ও মোদীজি কেন কেবল "যা উচিত মনে করো তাই করো" বলে দায় সেরেছিলেন।

সত্যকে হয়তো কিছুদিনের জন্য চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব।

পদাতিক বাংলা-র সাথে থাকুন এরকম গভীর ও সাহসী বিশ্লেষণের জন্য।

📢 এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর আগে পেতে

👉 আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত হোন ⚠️ সম্পূর্ণ খবর শুধুমাত্র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়

📢 গুরুত্বপূর্ণ খবর মিস করবেন না!

এই ধরনের খবরের আপডেট আগে জানতে আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত থাকুন

👉 Telegram-এ যুক্ত হোন
⚠️ সম্পূর্ণ খবর শুধুমাত্র ওয়েবসাইটে

লোড হচ্ছে...