|
কারাগারের অন্ধকারে প্রেমের পরিণয়: খুনি দম্পতির বিয়ে ঘিরে রাজস্থানে তীব্র আইনি ও নৈতিক বিতর্ক কারাগার—শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উঁচু দেওয়াল, কাঁটাতারের বেড়া আর একরাশ অন্ধকার। যেখানে স্বাধীনতা বিলাসিতা, সেখানে ‘প্রেম’ বা ‘পরিণয়’ শব্দগুলো অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব অনেক সময় সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। রাজস্থানের জয়পুরের একটি উন্মুক্ত কারাগার (Open-air Prison) এমনই এক ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছে, যা একই সাথে স্তম্ভিত করেছে সমাজকে এবং উসকে দিয়েছে আইনি বিতর্ক। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই কুখ্যাত অপরাধী—প্রিয়া শেঠ এবং হনুমান প্রসাদ—নিজেদের অন্ধকার অতীতকে সঙ্গী করেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছেন। ১. অপরাধের খতিয়ান: রক্তের দাগে মাখা ইতিহাস এই প্রেমের গল্প কোনো সাধারণ ভালোবাসার গল্প নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে নৃশংসতা এবং দুটি পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনী। বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে প্রিয়া ও হনুমান দুজনেই সমাজের চোখে ‘খুনি’। প্রিয়া শেঠ ও সুটকেস হত্যাকাণ্ড ২০১৮ সালে জয়পুর শহর কেঁপে উঠেছিল দুষ্মন্ত শর্মা নামক যুবকের অন্তর্ধান ও হত্যাকাণ্ডে। প্রিয়া ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে দুষ্মন্তকে ফাঁদে ফেলে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করেন। পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মৃতদেহ একটি সুটকেসে ভরে ফেলে দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। হনুমান প্রসাদ ও পরিবারের বিনাশ ২০১৭ সালে আলওয়ার জেলায় ঘটে এক গণহত্যাকাণ্ড। প্রেমের পথে বাধা সরাতে হনুমান ও তাঁর সহযোগীরা সন্তোষ শর্মার স্বামী, তিন সন্তান এবং এক ভাইপোকে হত্যা করেন। এই নৃশংস অপরাধের দায়ে ২০২৩ সালে তিনিও আমৃত্যু কারাদণ্ড পান। ২. ওপেন জেলের হাওয়া এবং প্রেমের অঙ্কুরোদগম প্রশ্ন উঠছে—যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দুই অপরাধী কীভাবে একে অপরের সংস্পর্শে এলেন? এর উত্তর রাজস্থানের বিশেষ কারাগার ব্যবস্থায়। জয়পুরের সাঙ্গানের এলাকায় রয়েছে একটি Open Jail। এখানে সেই বন্দিদের রাখা হয়— • যাদের আচরণ ভালো • যাদের সমাজের জন্য তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কম এই জেলে বন্দিরা দিনে বাইরে কাজ করতে পারেন এবং সন্ধ্যার আগে ফিরে আসেন। এই তুলনামূলক মুক্ত পরিবেশেই গত এক বছরে প্রিয়া ও হনুমানের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ৩. আইনি লড়াই: প্রেমের জন্য প্যারোল জেলবন্দি অবস্থায় বিয়ে করা সহজ নয়। প্রয়োজন আদালতের অনুমতি। প্রিয়া ও হনুমান রাজস্থান হাইকোর্টে আবেদন করেন। তাঁদের আইনজীবী যুক্তি দেন— বন্দি হলেও মৌলিক অধিকার অনুযায়ী বিবাহের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। গত ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ আদালত প্যারোল কমিটিকে নির্দেশ দেয় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে। এরপর দুজনকে ১৫ দিনের বিশেষ প্যারোল দেওয়া হয়। ৪. বিয়ের সানাই বনাম বিচারপ্রার্থীর চোখের জল আগামী শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ হনুমানের গ্রাম আলওয়ারের বারোদামেও-তে বিয়ের আয়োজন রয়েছে। কিন্তু এই বিয়ে ঘিরে আনন্দের চেয়ে বিতর্কই বেশি। দুষ্মন্ত শর্মার পরিবারের আইনজীবী প্রশ্ন তুলেছেন— “যেখানে ভুক্তভোগীরা আজও যন্ত্রণায়, সেখানে অপরাধীদের উৎসব করার সুযোগ দেওয়া কি ন্যায়বিচার?” পরিবার প্যারোল আদেশের বিরুদ্ধে আবার আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৫. সমাজের নৈতিক বিতর্ক: মানবিকতা না কি অপরাধে প্রশ্রয়? এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্ন তুলেছে— সংস্কারমূলক বিচার (Reformative Justice) অপরাধীকেও সমাজের মূল ধারায় ফেরার সুযোগ দেওয়া উচিত। প্রতিশোধমূলক বিচার (Retributive Justice) অপরাধের ভয়াবহতা অনুযায়ী কঠোর শাস্তি হওয়াই ন্যায়। পক্ষে থাকা যুক্তি বলছে—রাষ্ট্র জীবন কেড়ে নেয়নি, কেবল স্বাধীনতা কেড়েছে। বিপক্ষে থাকা যুক্তি বলছে—ভুক্তভোগীদের পরিবারকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ৬. পদাতিক বাংলার পাঠকদের জন্য ভাবনা Padatik Bangla সবসময় খবরের অন্তরালের সত্য খোঁজে। এই ঘটনা দেখায় মানুষের প্রবৃত্তি কতটা জটিল। একদিকে তারা অন্যের জীবন কেড়ে নিয়েছে, অন্যদিকে কারাগারে বসেও ভালোবাসার কাঙাল হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন রয়ে যায়— এই বিয়ের উলুধ্বনির আড়ালে কি চাপা পড়ে যাবে নিহতদের আত্মচিৎকার? উপসংহার প্রিয়া শেঠ এবং হনুমান প্রসাদের এই মিলন রাজস্থানের ইতিহাসে এক বিরল উদাহরণ। রাজস্থান ওপেন এয়ার ক্যাম্প রুলস (১৯৭২)-এর অধীনে পাওয়া এই সুযোগ কি সত্যিই পুনর্বাসনের পথ? না কি এটি বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে? অন্ধকারের আড়ালে শুরু হওয়া এই প্রেম আবারও প্রমাণ করে দিল— মানুষ যেখানেই থাকুক, সম্পর্কের বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। আরও গভীর সমাজ ও আইনি বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন পদাতিক বাংলা। |
জয়পুরে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দুই খুনির প্রেম: অন্ধকারের আড়ালে অবশেষে চার হাত এক