|
ভোটার তালিকায় ‘শুদ্ধিকরণ’ না কি গণতান্ত্রিক অধিকারের সংকট? অমর্ত্য সেনের সতর্কবার্তা ও বাংলার প্রেক্ষাপট গণতন্ত্রের মূল উৎস হলো মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার যদি প্রশাসনিক জটিলতা বা ‘ভুল’ তথ্যের বেড়াজালে আটকে যায়, তবে গণতান্ত্রিক কাঠামোটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের শুরু করা Special Intensive Revision (SIR) প্রক্রিয়া ঘিরে রাজ্য রাজনীতি এখন উত্তাল। এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তাঁর মন্তব্য— “অত্যন্ত তাড়াহুড়োর মধ্যে এই সংশোধন করা হচ্ছে”— আজ বাংলার প্রতিটি সচেতন নাগরিকের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অমর্ত্য সেনের উদ্বেগ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ৯২ বছর বয়সী অমর্ত্য সেন পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন, যেভাবে দ্রুতগতিতে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, খোদ অমর্ত্য সেন নিজেও এই প্রক্রিয়ার কবলে পড়েছেন। শান্তিনিকেতনের বাসভবনে কমিশনের পক্ষ থেকে তাঁকে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল তথাকথিত ‘Logical Discrepancy’ বা তথ্যগত অসংগতির অভিযোগে। পরে কমিশন একে যান্ত্রিক ভুল বললেও, এই ঘটনা প্রমাণ করে— যদি নোবেলজয়ীর নামেই ভুল হয়, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কী অবস্থা হবে? SIR কী এবং কেন এই বিতর্ক? সাধারণত প্রতি বছর ভোটার তালিকার সংক্ষিপ্ত সংশোধন হয়। কিন্তু Special Intensive Revision হলো একটি গভীর এবং ব্যাপক প্রক্রিয়া। কমিশনের দাবি—ভুয়া ভোটার, মৃত ভোটার বা পরিযায়ীদের নাম বাদ দিয়ে একটি ‘পরিষ্কার’ তালিকা তৈরি করাই উদ্দেশ্য। তবে বিতর্কের মূলে রয়েছে তিনটি বড় কারণ— ১. Logical Discrepancy প্রায় ১.২৫ কোটিরও বেশি ভোটার এই বিভাগে পড়েছেন। কারোর বাবা-মায়ের বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের কম, কারোর একই বাড়িতে অস্বাভাবিক বেশি ভোটার। ২. সময়সীমার সংকট বিধানসভা নির্বাচন সামনে। এত অল্প সময়ে কোটি কোটি তথ্য যাচাই কার্যত অসম্ভব। ৩. হয়রানি ও চাপ গ্রামীণ প্রবীণ ও প্রান্তিক নাগরিকদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিডিও অফিসে হাজির হতে হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ ও সাধারণের স্বস্তি এই প্রক্রিয়া নিয়ে বহু পক্ষ সুপ্রিম কোর্টে যায়। আদালত ২০ জানুয়ারি ২০২৬-এ গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়— স্বচ্ছতা: ১.২৫ কোটির তালিকা গ্রাম পঞ্চায়েত ও ব্লক অফিসে টাঙাতে হবে। প্রতিনিধির মাধ্যমে শুনানি: ভোটার নিজে না এসে বিএলএ-২ বা প্রতিনিধি নথি জমা দিতে পারবেন। অতিরিক্ত সময়: আরও ১০ দিন সময় বাড়ানো হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ নয়: কেবল অফিশিয়াল সার্কুলারের মাধ্যমে নির্দেশিকা প্রচার করতে হবে। প্রশাসনিক গাফিলতি না কি রাজনৈতিক চাল? অমর্ত্য সেন বলেছেন— “নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ভোট দিতে সমস্যায় না পড়েন।” কিন্তু বাস্তবে বহু বৈধ ভোটার আতঙ্কিত। প্রশ্ন উঠছে—যে সফটওয়্যার ১৫ বছরের ব্যবধানকে ‘অসংগতি’ বলছে, তা কি ভারতের সামাজিক বাস্তবতা (বাল্যবিবাহ, নথিভিত্তিক ভুল) বুঝতে সক্ষম? বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও প্রশ্ন তুলেছেন— “১৫ বছরের ব্যবধানকে কেন অসংগতি ধরা হবে?” ‘পদাতিক বাংলা’-র দৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের লড়াই এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেই সাধারণ ‘পদাতিক’ মানুষ— কৃষক ও দিনমজুর: কাজে না গেলে সংসার চলে না, অথচ অফিসের চক্কর দিতে হচ্ছে। প্রবীণ নাগরিক: ৮০-৯০ বছরের মানুষকে অস্তিত্ব প্রমাণ করতে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। প্রান্তিক সমাজ: বানান বা বয়সের সামান্য ভুলেও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। উপসংহার: গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে? ভোটার তালিকা নির্ভুল করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় যদি ‘উদ্ধার’-এর চেয়ে ‘উৎপীড়ন’ বেশি হয়, তবে তা হিতে বিপরীত। অমর্ত্য সেনের সতর্কবার্তা মনে করিয়ে দেয়— প্রযুক্তির চেয়ে মানুষের অধিকার বড়। যদি লক্ষ লক্ষ প্রকৃত ভোটার বাদ পড়েন, তবে আগামী নির্বাচন কি প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটাবে? নির্বাচন কমিশনকে মনে রাখতে হবে, তাদের দায়িত্ব কেবল তালিকা তৈরি নয়— প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। গণতন্ত্রের গভীর বিশ্লেষণের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন পদাতিক বাংলা। |
গণতন্ত্র আজ বিপন্ন, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এই তাড়াহুড়ো অশনি সংকেত — অমর্ত্য সেন