|
২০২৬-এর শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্য: যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ হতে চলেছে কি বিশ্ব? ২০২৬ সালের শুরুটা বিশ্ববাসীর জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক হয়নি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, তা গত কয়েক দশকের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে এখন শান্তির পরিবর্তে রণতরীর ইঞ্জিনের গর্জন আর যুদ্ধবিমানের মহড়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো বিশালাকার মার্কিন ‘আর্মাডা’ মোতায়েনের পর পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি বিশ্বজুড়ে এক কম্পন সৃষ্টি করেছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো ছোট হামলাকেও ইরান “পুরোদস্তুর যুদ্ধ” হিসেবে গণ্য করবে। মার্কিন সমর-কৌশল: ‘সর্বোচ্চ চাপ’ যখন সামরিক হুমকিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই ইরানের প্রতি তাঁর নীতি ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। বর্তমানে পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থান নিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, পারমাণবিক সাবমেরিন এবং কয়েক ডজন এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো লোহিত সাগরে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে, তা বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ। তবে বিশ্লেষকদের মতে এটি আসলে তেহরানের ওপর এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ—Psychological Warfare। খামেনেইয়ের “অন্তিম বার্তা”: প্রতিরোধের নতুন মাত্রা মার্কিন রণতরীর উপস্থিতিতে ইরান যে বিচলিত নয়, তা প্রমাণ করতে খামেনেই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমেরিকা যদি মনে করে ভয় দেখিয়ে আমাদের পিছু হঠাবে, তবে তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছে।” খামেনেইয়ের নির্দেশ অনুযায়ী ইরান এখন ‘প্রি-এমপ্টিভ স্ট্রাইক’ বা আগাম হামলার সক্ষমতা যাচাই করছে। কয়েক হাজার কামিকাজে ড্রোন এবং হাইপারসনিক মিসাইল দিয়ে পাল্টা আঘাত হানার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিক্ষোভের প্রভাব ইরানের ভেতরে ২০২৫-এর শেষভাগ থেকে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও মানবাধিকার প্রশ্নে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ট্রাম্প প্রশাসন এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বলে তেহরান অভিযোগ করছে। তবে ইতিহাস বলে, বাহ্যিক হুমকি আসলে ইরানের জনগণকে একতাবদ্ধ করে। খামেনেই সেই জাতীয়তাবাদের কার্ড খেলছেন—যুদ্ধের আবহে ভিতরের কোন্দল মিটে যাচ্ছে। জুনের হামলা ও পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ২০২৫ সালের জুনে ইসফাহান ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার পর ইরান IAEA-এর সাথে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা বর্তমানে ৬০ শতাংশেরও বেশি বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটি এক স্পষ্ট Red Line। ভূ-রাজনৈতিক জোট: রাশিয়া ও চীনের অবস্থান এই সংকটে ইরান একা নয়। রাশিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর হয়েছে এবং চীন ইরানের প্রধান অর্থনৈতিক সহযোগী। রাশিয়া এস-৪০০/এস-৫০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ায় মার্কিন আকাশপথে বড় বাধা তৈরি হতে পারে। চীনও সতর্ক করেছে যে একতরফা হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকটের অশনি সংকেত হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ইরান যদি এটি বন্ধ করে দেয়, তবে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০-২০০ ডলার ছাড়াতে পারে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য সংকট এবং বিশ্ব অর্থনীতির ধস অনিবার্য হয়ে উঠবে। আধুনিক যুদ্ধের রূপরেখা: প্রক্সি ও সাইবার লড়াই যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু ট্যাংক-কামানের লড়াই হবে না। ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক—হিজবুল্লাহ, হুথি ও শিয়া মিলিশিয়ারা মুহূর্তেই ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ শুরু করবে। পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধও বড় অস্ত্র হয়ে উঠবে। যুদ্ধ হবে বহুমাত্রিক—স্থল, জল, আকাশ এবং ডিজিটাল জগতে। শান্তির কি কোনো পথ খোলা আছে? কাতার, ওমান ও তুরস্ক পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক আলোচনা চালাচ্ছে। তবে ট্রাম্পের কঠোর শর্ত এবং খামেনেইয়ের অনড় অবস্থান শান্তির রাস্তা সংকুচিত করছে। বিশ্ব এখন জাতিসংঘ ও ইউরোপের দিকে তাকিয়ে। উপসংহার মধ্যপ্রাচ্য এখন এক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মার্কিন আর্মাডার উপস্থিতি এবং ইরানের যুদ্ধপ্রস্তুতি প্রমাণ করে, দুই পক্ষই চূড়ান্ত পরিণতির জন্য প্রস্তুত। এই সংঘাত শুরু হলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। পদাতিক বাংলা-র পাঠকদের প্রতি আহ্বান—এই স্পর্শকাতর সময়ে গুজবে কান না দিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের সাথে থাকুন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই দাবা খেলায় আগামী কয়েক দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন পদাতিক বাংলা। আমাদের সাথেই থাকুন। |
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরী মোতায়েন: যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান; ট্রাম্পকে অন্তিম বার্তা খামেনেইয়ের