|
ভারতের অর্থনীতি কি সত্যিই উন্নয়নের মহাসড়কে, নাকি চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে সংকট? ভারতের অর্থনীতি কি সত্যিই উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটছে, নাকি এই উজ্জ্বল পরিসংখ্যানের নীচে জমে উঠছে এক গভীর অস্বস্তি? সম্প্রতি ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) ২০২৬-এর মঞ্চে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আইএমএফ-এর (IMF) প্রাক্তন ফার্স্ট ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর গীতা গোপিনাথ যে বক্তব্য রেখেছেন, তা নিয়ে জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নোটবন্দির ক্ষত থেকে শুরু করে বর্তমানের দূষণ সমস্যা—গোপিনাথের প্রতিটি শব্দ যেন মোদী সরকারের অর্থনৈতিক মডেলের জন্য এক একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন। ১. শুল্ক যুদ্ধের চেয়েও বড় শত্রু ‘দূষণ’ সাধারণত কোনো দেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলে বৈদেশিক বাণিজ্য, ডলারের দাম বা আমদানি-রপ্তানি শুল্ক (Tariff) নিয়ে কথা হয়। কিন্তু গোপিনাথ ডাভোসের মঞ্চে এক বিস্ফোরক দাবি করলেন। তিনি বলেন, “ভারতের অর্থনীতির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য শুল্কের চেয়েও বড় বিপদ হলো দেশের দূষণ।” তিনি তথ্য দিয়ে দেখান যে, ভারতে প্রতি বছর দূষণের কারণে প্রায় ১৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, যা দেশের মোট মৃত্যুর ১৮ শতাংশ। এই বিপুল প্রাণহানি কেবল মানবিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি বিরাট অর্থনৈতিক বিপর্যয়। যখন কাজের বয়সে মানুষ মারা যায় বা অসুস্থ হয়, তখন দেশের উৎপাদনশীলতা (Labor Productivity) কমে যায়। গোপিনাথের মতে, দূষণ ভারতের জিডিপির প্রায় ৩% থেকে ৯% পর্যন্ত খেয়ে ফেলছে। ২. নোটবন্দি: একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত? গোপিনাথ দীর্ঘদিন ধরেই নোটবন্দি বা Demonetization নিয়ে তার নেতিবাচক অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন। হার্ভার্ডে গবেষণাপত্র জমা দিয়ে তিনি আগেই প্রমাণ করেছিলেন যে, ২০১৬ সালের সেই সিদ্ধান্তে ভারতের জিডিপি অন্তত ২ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ডাভোসের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে অর্থনীতির বড় অংশ অসংগঠিত (Informal Sector), সেখানে নগদ টাকার সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া কোনো কাজের কথা ছিল না। তিনি মনে করেন, দুর্নীতি দমনের নামে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত আসলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে, যার রেশ আজও কাটেনি। ৩. উন্নয়নের আড়ালে ‘কর্মহীন প্রবৃদ্ধি’ (Jobless Growth) মোদী সরকার যখন ভারতকে ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম অর্থনীতি বানানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তখন গোপিনাথ এর অন্ধকার দিকটি তুলে ধরেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, ভারতের প্রবৃদ্ধি মূলত ‘ক্যাপিটাল-ইনটেনসিভ’ বা পুঁজি-নির্ভর। অর্থাৎ বড় বড় কোম্পানি লাভ করছে, শেয়ার বাজার বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। গোপিনাথের মতে, ভারতকে যদি ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হতে হয়, তবে অন্তত ৬ কোটি থেকে ১৪ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। যদি তা না হয়, তবে এই বিপুল জনসংখ্যা ভারতের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। ৪. বিনিয়োগকারীদের পিছুটান এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ প্রধানমন্ত্রী মোদী ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতে ডাকছেন। কিন্তু গীতা গোপিনাথ একটি রূঢ় বাস্তব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী যখন ভারতে ব্যবসা করতে আসবে, তখন সে তার কর্মীদের স্বাস্থ্য এবং বসবাসের পরিবেশ নিয়েও ভাববে। উত্তর ভারতের এবং বিশেষ করে দিল্লির বাতাসের যে বিষাক্ত মান, তা বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গোপিনাথের ভাষায়, “পরিবেশ অনুকূল না হলে বড় বিনিয়োগকারী কেবল ট্যাক্স ছাড় দেখে আসবে না।” ৫. বিচারবিভাগ ও জমি সংস্কারের বাধা সরকার যখন ইজ অফ ডুইং বিজনেস (Ease of Doing Business) নিয়ে বড় বড় দাবি করে, তখন গোপিনাথ মনে করিয়ে দেন যে, ভারতে এখনও জমি কেনা বা আইনি লড়াই জেতা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। বিচারবিভাগের দীর্ঘসূত্রতা এবং জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ভারতের উন্নতির গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। তিনি সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন, এই বিষয়গুলোতে ‘ওয়ার ফুটিং’ বা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করতে হবে। উপসংহার: গোপিনাথের সতর্কবার্তা কি শুনবে সরকার? গীতা গোপিনাথ সরাসরি রাজনীতির লোক নন, তবে তার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ মোদী সরকারের ব্র্যান্ডিংয়ের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। নোটবন্দির ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের দিকে নজর না দিলে ভারতের ৩য় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার গৌরব কেবল খাতা-কলমেই থেকে যাবে, সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন ঘটবে না। ভারতের সামনে এখন প্রশ্ন একটাই—চাকচিক্য ধরে রাখবে, নাকি বাস্তব সংকটকে স্বীকার করে সত্যিকারের উন্নয়নের পথে হাঁটবে? |
নোটবন্দি থেকে দূষণ—বিপর্যয়ের মুখে ভারতের অর্থনীতি! মোদী সরকারকে বিঁধলেন IMF এর প্রাক্তন DMD গীতা গোপিনাথ