|
জেলের সেলে পিঁপড়েদের পাঠশালা: সোনাম ওয়াংচুকের নীরব বিপ্লব ও অসমাপ্ত সংগ্রাম বর্তমানে ভারতের সমাজ-রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত নাম সোনাম ওয়াংচুক। লাদাখের বরফ ঢাকা পাহাড় থেকে শুরু করে দিল্লির রাজপথ—সবখানেই তিনি এক পরিচিত মুখ। কিন্তু ২০২৬ সালের এই জানুয়ারিতে তাঁর ঠিকানা লাদাখের মনোরম পাহাড় নয়, বরং রাজস্থানের উত্তপ্ত যোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-এর একটি নির্জন সেল। জাতীয় নিরাপত্তা আইন বা NSA-এর অধীনে ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বন্দি এই পরিবেশকর্মী। অথচ বন্দিদশাতেও তাঁর প্রতিবাদ থেমে নেই। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে তিনি নিচ্ছেন জীবন ও বিপ্লবের পাঠ—কার কাছে? জেলের মেঝের পিঁপড়েদের কাছ থেকে। পিঁপড়েদের পাঠশালা ও সংহতির শিক্ষা কারাগারের একটি সেল সাধারণত হতাশা ও নিঃসঙ্গতার প্রতীক। কিন্তু সোনাম ওয়াংচুক সেই জায়গাকেই রূপ দিয়েছেন এক অদ্ভুত পাঠশালায়। তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আঙমো জানিয়েছেন, ওয়াংচুক জেলের ভেতর একটি পিঁপড়ের কলোনি গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। এমনকি তিনি জেল কর্তৃপক্ষের কাছে পিঁপড়েদের আচরণ নিয়ে লেখা বই চেয়েছেন। ওয়াংচুকের মতে, পিঁপড়েরা আমাদের শেখায় প্রকৃত সংহতি ও দলীয় শক্তি। একটি পিঁপড়ে একা কিছুই নয়, কিন্তু হাজার হাজার পিঁপড়ে একসঙ্গে হলে পাহাড়সম বাধাও অতিক্রম করা সম্ভব। লাদাখের মানুষ যখন নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে, তখন জেলের মেঝেতে এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের মধ্যেই তিনি সেই লড়াইয়ের প্রতীক খুঁজে পাচ্ছেন। কংক্রিটের ফাটল গলে বেরিয়ে আসা পিঁপড়ের সারি তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে নীরব বিপ্লবের ভাষা। হিমালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বিজ্ঞানের কারিগর সোনাম ওয়াংচুককে অনেকেই বলেন ‘রিয়েল লাইফ ফুনসুখ ওয়াংড়ু’। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন SEC MOL—যেখানে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বাস্তব জীবনমুখী শিক্ষা। লাদাখের সেই ছাত্ররা, যারা প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যর্থ বলে চিহ্নিত হয়েছিল, তাঁর হাত ধরেই নতুন পথে হাঁটার সুযোগ পায়। এরপর আসে তাঁর যুগান্তকারী উদ্ভাবন আইস স্তূপা। জলসংকট কবলিত লাদাখে কৃত্রিম হিমবাহ তৈরি করে কৃষিকে বাঁচানোর এই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়। ভারতীয় সেনার জন্য তৈরি তাঁর সৌরশক্তি চালিত কাদার ঘরগুলো মাইনাস তাপমাত্রাতেও উষ্ণতার আশ্রয় দেয়। অথচ আজ সেই উদ্ভাবককেই জোধপুর জেলের মেঝেতে একটি কম্বলের ওপর রাত কাটাতে হচ্ছে। নেই খাট, নেই টেবিল—তবুও তাঁর উদ্ভাবনী মন থেমে নেই। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন এমন সেলের, যেখানে সৌরশক্তির মাধ্যমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। লাদাখের লড়াই: কেন এই বন্দিদশা? ৩৭০ ধারা বিলোপের পর লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হলেও সেখানকার মানুষের আশঙ্কা কমেনি। ভূমি, পরিবেশ ও সংস্কৃতি রক্ষার দাবিতে ষষ্ঠ তফশিল-ভুক্তির প্রশ্নে ওয়াংচুক দীর্ঘদিন আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে লেহ-তে শুরু হওয়া এক প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই তাঁর বিরুদ্ধে অশান্তি সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়। আইনজীবীদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে জারি করা আটকাদেশ ছিল পুলিশের রিপোর্টের হুবহু প্রতিলিপি। এমনকি জেলের ভেতর তাঁকে যে সংবাদপত্র দেওয়া হয়, সেখানে ওয়াংচুক সংক্রান্ত খবর কাঁচি দিয়ে কেটে বাদ দেওয়া হয়—যেন তিনি বাইরের জনসমর্থনের খবর জানতে না পারেন। পিঁপড়েদের শৃঙ্খলা ও মানুষের স্বাধীনতা ওয়াংচুকের পিঁপড়ে পর্যবেক্ষণ নিছক কৌতূহল নয়—এটি এক প্রতীকী প্রতিবাদ। পিঁপড়েরা যেমন নিঃশব্দে ঘর গড়ে তোলে এবং প্রতিকূলতায় ভেঙে পড়ে না, লাদাখের মানুষও তেমনই। তাঁর বিশ্বাস, জেল-জুলুম দিয়ে মানুষের ন্যায্য দাবি থামানো যায় না। যে মানুষটি শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় ২১ দিন অনশন করতে পারেন, জেলের দেয়াল তাঁর মনোবল ভাঙতে পারে না। শেষ কথা: ২৯শে জানুয়ারির প্রতীক্ষায় আগামী ২৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে সোনাম ওয়াংচুকের বন্দিদশা নিয়ে চূড়ান্ত শুনানি। আদালত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু স্পষ্ট—একজন মানুষকে শারীরিকভাবে বন্দি করা গেলেও তাঁর চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে শৃঙ্খলিত করা যায় না। জেলের মেঝেতে পিঁপড়েদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত ওয়াংচুকের কাছে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি। লাদাখ থেকে জোধপুর—দূরত্ব অনেক। কিন্তু এই নীরব লড়াই আজ ভারতের পরিবেশপ্রেমী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে নতুন ঢেউ তুলেছে। পিঁপড়েদের সেই সংহতিই যেন আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। |
যোধপুরে জেলের মেঝেতে বিপ্লবের পাঠ: পিঁপড়েদের কাছ থেকে জীবন শিখছেন সোনাম ওয়াংচুক