|
সুপ্রিম রায়ে চুরমার দিল্লির রক্ষাকবচ। এবার সিবিআই অনুমতি ছাড়াই কেন্দ্রীয় অফিসারদের গ্রেফতার করতে পারবে রাজ্য পুলিশ। বিস্তারিত পড়ুন পদাতিক বাংলায়। পদাতিক বাংলা ডেস্ক: ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ দিনটি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এতদিন পর্যন্ত সাধারণ ধারণা ছিল যে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীরা কেবলমাত্র কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা সিবিআই-এর (CBI) কাছেই দায়বদ্ধ। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক ঐতিহাসিক রায় সেই দীর্ঘদিনের আইনি ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে। বিচারপতি জে.বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মা-র ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসে কেন্দ্রীয় সরকারি আধিকারিকরা যদি কোনও দুর্নীতি করেন, তবে তাঁদের তদন্ত বা গ্রেফতারের জন্য রাজ্য পুলিশকে আর দিল্লির বা সিবিআই-এর অনুমতির অপেক্ষা করতে হবে না। এই রায় কেবল একটি আইনি ব্যাখ্যা নয়, বরং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের সংঘাত চলেছে, সেখানে এই নির্দেশ রাজ্যের হাতে একটি শক্তিশালী পাল্টা অস্ত্র তুলে দিয়েছে। ১. প্রেক্ষাপট: মমতার বাংলা বনাম কেন্দ্রীয় এজেন্সি ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই ‘দুর্নীতি’ এবং ‘তদন্ত’ রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এই সংঘাতের সূচনা হয় মূলত সারদা চিটফান্ড কাণ্ড থেকে। সারদা ও নারদ কাণ্ড: ২০১৪ সাল থেকে সারদা মামলায় সিবিআই সক্রিয় হওয়ার পর একে একে তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক শীর্ষ নেতার নাম জড়াতে থাকে। মদন মিত্র ও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারাবাস রাজ্য সরকারকে প্রবল চাপে ফেলে। এরপর নারদ স্টিং অপারেশন রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন বিস্ফোরণ ঘটায়। ২০২১ সালের নির্বাচনের ঠিক পরেই ফিরহাদ হাকিম ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের গ্রেফতারি রাজ্য-দিল্লি সংঘাতকে আরও গভীর করে তোলে। নিয়োগ দুর্নীতি ও ইডি-সিবিআই অভিযান: স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন কেলেঙ্কারি, কয়লা ও গোরু পাচার মামলায় ইডি ও সিবিআই-এর লাগাতার সক্রিয়তা নবান্নকে দিল্লি-বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানে আরও কঠোর করে তোলে। ২. কেন এই রায় ‘উল্টে গেল বাজি’? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে কেন্দ্রীয় সরকার ইডি ও সিবিআই-কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সিবিআই-এর ওপর থেকে জেনারেল কনসেন্ট প্রত্যাহার করলেও কেন্দ্রীয় এজেন্সির দাপট কমেনি। এতদিন কেন্দ্রীয় কর্মচারীরা এক ধরনের অলিখিত সুরক্ষা ভোগ করতেন। রাজ্য পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আইনি এক্তিয়ার দেখিয়ে তা চ্যালেঞ্জ করা হতো। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই রায় সেই সুরক্ষাকবচ ভেঙে দিয়েছে। এখন থেকে রাজ্যের মাটিতে কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের দুর্নীতির তদন্ত করতে রাজ্য পুলিশের পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। ৩. সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্ট Nawal Kishore Meena বনাম রাজস্থান সরকার মামলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে— সিবিআই-এর একচেটিয়া অধিকার নেই: দিল্লি স্পেশাল পুলিশ এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট (DSPE Act) রাজ্য পুলিশের ক্ষমতা খর্ব করে না। দুর্নীতি দমন আইনের ধারা ১৭: তদন্তকারী অফিসার রাজ্যের হোন বা কেন্দ্রের—যোগ্য পদমর্যাদা থাকলেই তদন্ত বৈধ। ভৌগোলিক অধিকার: রাজ্যের সীমানার মধ্যে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করার অধিকার রাজ্য পুলিশের আছে। ৪. নবান্নের হাতে এখন কী কী সুযোগ? এই রায়ের ফলে রাজ্য সরকারের সামনে নতুন কিছু পথ খুলে গেছে— ১. কেন্দ্রীয় দপ্তরে সরাসরি তদন্ত চালানোর আইনি বৈধতা ২. কেন্দ্রীয় অফিসারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতারি সম্ভব ৩. কেন্দ্রীয় এজেন্সির একতরফা দাপটের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি ৫. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ও মমতার দীর্ঘ লড়াই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষে সরব। ২০১৯ সালে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই হানার প্রতিবাদে তাঁর ধরনা আজও রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয়। এই রায় রাজ্য পুলিশের সাংবিধানিক মর্যাদাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ৬. তৃণমূল সমর্থকদের মনে কেন খুশির হাওয়া? তৃণমূল সমর্থকদের মতে, এতদিন তদন্তের পাল্লা ছিল একতরফা। এই রায়ের ফলে কেন্দ্রীয় অফিসারদের ক্ষেত্রেও সমান আইন প্রয়োগের রাস্তা খুলেছে। তাঁদের মতে—এবার সত্যিই ‘সমান মাঠে খেলা’ শুরু হলো। ৭. উপসংহার: আগামীর চিত্র কী? এই রায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একটি দু-ধারী তলোয়ার। সঠিক প্রয়োগ হলে দুর্নীতি কমবে, আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হলে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—২০২৬-এর শুরুতেই সুপ্রিম কোর্ট দিল্লির সেই পুরনো রক্ষাকবচ ভেঙে দিয়েছে। বাংলার মাটিতে কাজ করা কেন্দ্রীয় আধিকারিকদের এখন প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করে ফেলতে হবে। বাজি সত্যিই উল্টে গেছে। |
উল্টে গেল বাজি: সুপ্রিম ধাক্কায় দিল্লির রক্ষাকবচ চুরমার; এবার কেন্দ্রীয় অফিসারদের জালে ধরার অস্ত্র পেল রাজ্য