নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের গত এক দশকের রাজনীতিতে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি বা এসএসসি (SSC) কেলেঙ্কারি এমন এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, যা সহজে শুকোবার নয়। এই ঝড়ের কেন্দ্রে রয়েছেন ২৬,০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী, যাঁদের জীবন এক রাতেই এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এই লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে যিনি রাজপথ কাঁপিয়েছেন, তিনি হলেন সুমন বিশ্বাস। কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত বঙ্গ রাজনীতির সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে হঠাৎ করেই ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের নবগঠিত 'জনতা উন্নয়ন পার্টি' (JUP)-তে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যোগদান—সুমন বিশ্বাসের এই যাত্রা কি কোনো সুদূরপ্রসারী কৌশল নাকি নিছকই রাজনৈতিক পালাবদল?
এক রাতেই অন্ধকার: ২৬ হাজার পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস
২০১৬ সালের এসএসসি প্যানেল বাতিল হওয়ার ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও বিচারবিভাগীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতা হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে এক লহমায় চাকরি চলে যায় প্রায় ২৬,০০০ মানুষের। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন বিপুল অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে যে, 'যোগ্য' এবং 'অযোগ্য'দের আলাদা করা কার্যত অসম্ভব। এই রায়ের ফলে যেমন দুর্নীতিগ্রস্তরা কাজ হারিয়েছেন, তেমনই চরম সংকটে পড়েছেন সেই সব যোগ্য শিক্ষকরাও, যাঁরা কঠোর পরিশ্রম করে মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছিলেন।
এই বিশাল সংখ্যক মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সংগঠিত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সুমন বিশ্বাস। ব্যান্ডেলের এই শিক্ষক নিজে চাকরি হারানোর পর ঘরে বসে না থেকে গড়ে তুলেছিলেন 'যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষক মঞ্চ'। তাঁর নেতৃত্বে বারবার এসএসসি ভবন অভিযান, বিকাশ ভবন ঘেরাও এবং ধর্মতলার রাজপথে অবস্থান বিক্ষোভ রাজ্য সরকারকে বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছে। সুমন বিশ্বাসের একটি ডাকে হাজার হাজার চাকরিহারা শিক্ষক যখন কলকাতায় সমবেত হতেন, তখন তা প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিত।
গেরুয়া সংস্পর্শ ও শুভেন্দু অধিকারীর 'ছায়া'
আন্দোলনের শুরুর দিন থেকেই সুমন বিশ্বাসের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর এক ঘনিষ্ঠ সমীকরণ লক্ষ করা গিয়েছিল। বিরোধী দলনেতাকে বারবার সুমনদের প্রতিবাদী মঞ্চে উপস্থিত হতে দেখা গেছে। তিনি আন্দোলনকারীদের আইনি ও নৈতিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সুমন বিশ্বাস নিজেও প্রকাশ্য সভায় শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করেননি। এমনকি একবার তাঁকে আবেগপ্রবণ হয়ে বলতে শোনা গিয়েছিল, "শুভেন্দু অধিকারীই পারেন বাংলাকে এই দুর্নীতির অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে, তিনিই আগামী দিনে এই রাজ্যের সুযোগ্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দাবিদার।"
এর কিছুকাল পরেই সুমন বিশ্বাস আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগদান করেন। সেই সময় রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, শিক্ষক আন্দোলনের এই বিশাল জনসমর্থনকে বিজেপি সরাসরি দলীয় শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চাইছে। বিজেপির আইনজীবী সেল এই মামলাটি লড়ছিল, ফলে চাকরিহারাদের একটি বড় অংশ গেরুয়া শিবিরের প্রতি আস্থাশীল হয়েছিলেন। কিন্তু এই মুদ্রার একটি উল্টো পিঠও ছিল। বাম ও বিজেপি-র আইনজীবীদের একাংশ যখন নিয়োগ দুর্নীতিতে কঠোর সওয়াল করছিলেন, তখন অনেক সাধারণ শিক্ষক মনে করেছিলেন—তৃণমূলকে আক্রমণ করতে গিয়ে যেন তাঁদের চাকরির ভবিষ্যৎ চিরতরে অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বই হয়তো সুমনের মনে নতুন কোনো চিন্তার বীজ বুনে দিয়েছিল।
হঠাৎ কেন হুমায়ুন কবীর? এক 'বিস্ময়কর' দলবদল
বিজেপিতে যোগদানের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সুমন বিশ্বাসের এই সিদ্ধান্ত সবাইকে চমকে দিয়েছে। কেন তিনি শুভেন্দু অধিকারীর মতো হেভিওয়েট নেতার সঙ্গ ত্যাগ করে ভরতপুরের বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের হাত ধরলেন?
হুমায়ুন কবীর নিজে এক বর্ণময় রাজনৈতিক চরিত্র। শাসক দলের বিধায়ক হয়েও তিনি বারবার জেলা প্রশাসন ও নিজ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বহিষ্কার করা হলে তিনি গঠন করেন 'জনতা উন্নয়ন পার্টি'। এই দলের মূল লক্ষ্যই হলো তৃণমূল এবং বিজেপি—উভয় শক্তির বাইরে এক 'তৃতীয় বিকল্প' গড়ে তোলা। সুমন বিশ্বাস সেই দলেরই রাজ্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বড় দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
সুমন বিশ্বাসের এই পরিবর্তনের পিছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে: ১. রাজনৈতিক তকমা মোচনের চেষ্টা: সুমন হয়তো অনুধাবন করেছেন যে, সরাসরি বিজেপির ঝাণ্ডা তলায় থাকলে তাঁকে সারাক্ষণ 'দলীয় ক্যাডার' হিসেবে তকমা দেওয়া হবে, যা নিরপেক্ষ শিক্ষকদের আন্দোলনে বাধা হতে পারে। ২. আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব: হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদ ও সংলগ্ন জেলাগুলোতে যথেষ্ট প্রভাবশালী। সুমন হয়তো মনে করছেন একটি ছোট কিন্তু লড়াকু আঞ্চলিক দলের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা বেশি সহজ। ৩. বিজেপির কৌশল নিয়ে সংশয়: অনেক চাকরিহারা শিক্ষক মনে করেন, আইনি লড়াইয়ে যোগ্যদের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক লাভক্ষতির হিসাব বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেই জায়গা থেকেই হয়তো তিনি এই বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন।
আন্দোলন বনাম রাজনীতি: কোন পথে ২৬ হাজার শিক্ষক?
সুমন বিশ্বাসের এই ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন কি আন্দোলনকে দুর্বল করবে? চাকরিহারাদের একাংশের মতে, সুমন বিশ্বাসের লড়াই কোনো সুনির্দিষ্ট দলের পতাকার মুখাপেক্ষী নয়। তাঁর মূল দাবি—যোগ্যদের পুনর্বহাল এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা।
তবে সমালোচকরা অন্য কথা বলছেন। তাঁদের মতে, সুমন বিশ্বাস একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা হিসেবে বারবার রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তন করছেন। শুভেন্দু অধিকারীকে 'ভবিষ্যৎ মুখ্যমন্ত্রী' বলার ঠিক পরেই হুমায়ুন কবীরের মতো নেতার হাত ধরা তাঁর রাজনৈতিক স্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে যখন হুমায়ুন কবীরের দল মূলত 'অ্যান্টি-বিজেপি' অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তখন সুমনের এই পদক্ষেপ অনেক বিজেপি-পন্থী আন্দোলনকারীকে হতাশ করতে পারে।
উপসংহার: পদাতিক বাংলার বিশ্লেষণ
সুমন বিশ্বাস এখন কেবল একজন শিক্ষক নেতা নন, তিনি এখন একটি রাজনৈতিক দলের রাজ্যস্তরের অন্যতম কাণ্ডারি। তাঁর কাঁধে এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব। একদিকে যেমন ২৬,০০০ চাকরিহারা পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জিইয়ে রাখা, অন্যদিকে হুমায়ুন কবীরের নতুন দলকে রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করা।
তবে মূল প্রশ্নটি এখনো অধরা—এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনে কি ২৬,০০০ যোগ্য শিক্ষকের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত সুরক্ষিত হবে? সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে এখনও যোগ্য-অযোগ্য বাছাইয়ের বিষয়টি বিচারাধীন। আদালত যদি শেষ পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি বাতিলের পক্ষেই অনড় থাকে, তবে এই দলবদল কেবল ইতিহাসের পাতায় এক ছোট পরিচ্ছেদ হয়েই থাকবে। কিন্তু যদি এই নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ সরকারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা হবে এক নতুন লড়াইয়ের সূচনা।
পশ্চিমবঙ্গের এই শিক্ষক আন্দোলনের নতুন এই মোড় আগামী ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে সুমন বিশ্বাস এটুকু প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, বাংলার রাজনীতিতে 'স্থায়ী শত্রু' বা 'স্থায়ী মিত্র' বলে কিছু নেই—সবই পরিবর্তিত সময়ের দাবি।
এক রাতেই অন্ধকার: ২৬ হাজার পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস
২০১৬ সালের এসএসসি প্যানেল বাতিল হওয়ার ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও বিচারবিভাগীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতা হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে এক লহমায় চাকরি চলে যায় প্রায় ২৬,০০০ মানুষের। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন বিপুল অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে যে, 'যোগ্য' এবং 'অযোগ্য'দের আলাদা করা কার্যত অসম্ভব। এই রায়ের ফলে যেমন দুর্নীতিগ্রস্তরা কাজ হারিয়েছেন, তেমনই চরম সংকটে পড়েছেন সেই সব যোগ্য শিক্ষকরাও, যাঁরা কঠোর পরিশ্রম করে মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছিলেন।
এই বিশাল সংখ্যক মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সংগঠিত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সুমন বিশ্বাস। ব্যান্ডেলের এই শিক্ষক নিজে চাকরি হারানোর পর ঘরে বসে না থেকে গড়ে তুলেছিলেন 'যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষক মঞ্চ'। তাঁর নেতৃত্বে বারবার এসএসসি ভবন অভিযান, বিকাশ ভবন ঘেরাও এবং ধর্মতলার রাজপথে অবস্থান বিক্ষোভ রাজ্য সরকারকে বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছে। সুমন বিশ্বাসের একটি ডাকে হাজার হাজার চাকরিহারা শিক্ষক যখন কলকাতায় সমবেত হতেন, তখন তা প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিত।
গেরুয়া সংস্পর্শ ও শুভেন্দু অধিকারীর 'ছায়া'
আন্দোলনের শুরুর দিন থেকেই সুমন বিশ্বাসের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর এক ঘনিষ্ঠ সমীকরণ লক্ষ করা গিয়েছিল। বিরোধী দলনেতাকে বারবার সুমনদের প্রতিবাদী মঞ্চে উপস্থিত হতে দেখা গেছে। তিনি আন্দোলনকারীদের আইনি ও নৈতিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সুমন বিশ্বাস নিজেও প্রকাশ্য সভায় শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করেননি। এমনকি একবার তাঁকে আবেগপ্রবণ হয়ে বলতে শোনা গিয়েছিল, "শুভেন্দু অধিকারীই পারেন বাংলাকে এই দুর্নীতির অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে, তিনিই আগামী দিনে এই রাজ্যের সুযোগ্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দাবিদার।"
এর কিছুকাল পরেই সুমন বিশ্বাস আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগদান করেন। সেই সময় রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, শিক্ষক আন্দোলনের এই বিশাল জনসমর্থনকে বিজেপি সরাসরি দলীয় শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চাইছে। বিজেপির আইনজীবী সেল এই মামলাটি লড়ছিল, ফলে চাকরিহারাদের একটি বড় অংশ গেরুয়া শিবিরের প্রতি আস্থাশীল হয়েছিলেন। কিন্তু এই মুদ্রার একটি উল্টো পিঠও ছিল। বাম ও বিজেপি-র আইনজীবীদের একাংশ যখন নিয়োগ দুর্নীতিতে কঠোর সওয়াল করছিলেন, তখন অনেক সাধারণ শিক্ষক মনে করেছিলেন—তৃণমূলকে আক্রমণ করতে গিয়ে যেন তাঁদের চাকরির ভবিষ্যৎ চিরতরে অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বই হয়তো সুমনের মনে নতুন কোনো চিন্তার বীজ বুনে দিয়েছিল।
হঠাৎ কেন হুমায়ুন কবীর? এক 'বিস্ময়কর' দলবদল
বিজেপিতে যোগদানের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সুমন বিশ্বাসের এই সিদ্ধান্ত সবাইকে চমকে দিয়েছে। কেন তিনি শুভেন্দু অধিকারীর মতো হেভিওয়েট নেতার সঙ্গ ত্যাগ করে ভরতপুরের বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের হাত ধরলেন?
হুমায়ুন কবীর নিজে এক বর্ণময় রাজনৈতিক চরিত্র। শাসক দলের বিধায়ক হয়েও তিনি বারবার জেলা প্রশাসন ও নিজ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বহিষ্কার করা হলে তিনি গঠন করেন 'জনতা উন্নয়ন পার্টি'। এই দলের মূল লক্ষ্যই হলো তৃণমূল এবং বিজেপি—উভয় শক্তির বাইরে এক 'তৃতীয় বিকল্প' গড়ে তোলা। সুমন বিশ্বাস সেই দলেরই রাজ্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বড় দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
সুমন বিশ্বাসের এই পরিবর্তনের পিছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে: ১. রাজনৈতিক তকমা মোচনের চেষ্টা: সুমন হয়তো অনুধাবন করেছেন যে, সরাসরি বিজেপির ঝাণ্ডা তলায় থাকলে তাঁকে সারাক্ষণ 'দলীয় ক্যাডার' হিসেবে তকমা দেওয়া হবে, যা নিরপেক্ষ শিক্ষকদের আন্দোলনে বাধা হতে পারে। ২. আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব: হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদ ও সংলগ্ন জেলাগুলোতে যথেষ্ট প্রভাবশালী। সুমন হয়তো মনে করছেন একটি ছোট কিন্তু লড়াকু আঞ্চলিক দলের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা বেশি সহজ। ৩. বিজেপির কৌশল নিয়ে সংশয়: অনেক চাকরিহারা শিক্ষক মনে করেন, আইনি লড়াইয়ে যোগ্যদের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক লাভক্ষতির হিসাব বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেই জায়গা থেকেই হয়তো তিনি এই বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন।
আন্দোলন বনাম রাজনীতি: কোন পথে ২৬ হাজার শিক্ষক?
সুমন বিশ্বাসের এই ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন কি আন্দোলনকে দুর্বল করবে? চাকরিহারাদের একাংশের মতে, সুমন বিশ্বাসের লড়াই কোনো সুনির্দিষ্ট দলের পতাকার মুখাপেক্ষী নয়। তাঁর মূল দাবি—যোগ্যদের পুনর্বহাল এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা।
তবে সমালোচকরা অন্য কথা বলছেন। তাঁদের মতে, সুমন বিশ্বাস একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা হিসেবে বারবার রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তন করছেন। শুভেন্দু অধিকারীকে 'ভবিষ্যৎ মুখ্যমন্ত্রী' বলার ঠিক পরেই হুমায়ুন কবীরের মতো নেতার হাত ধরা তাঁর রাজনৈতিক স্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে যখন হুমায়ুন কবীরের দল মূলত 'অ্যান্টি-বিজেপি' অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তখন সুমনের এই পদক্ষেপ অনেক বিজেপি-পন্থী আন্দোলনকারীকে হতাশ করতে পারে।
উপসংহার: পদাতিক বাংলার বিশ্লেষণ
সুমন বিশ্বাস এখন কেবল একজন শিক্ষক নেতা নন, তিনি এখন একটি রাজনৈতিক দলের রাজ্যস্তরের অন্যতম কাণ্ডারি। তাঁর কাঁধে এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব। একদিকে যেমন ২৬,০০০ চাকরিহারা পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জিইয়ে রাখা, অন্যদিকে হুমায়ুন কবীরের নতুন দলকে রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করা।
তবে মূল প্রশ্নটি এখনো অধরা—এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনে কি ২৬,০০০ যোগ্য শিক্ষকের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত সুরক্ষিত হবে? সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে এখনও যোগ্য-অযোগ্য বাছাইয়ের বিষয়টি বিচারাধীন। আদালত যদি শেষ পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি বাতিলের পক্ষেই অনড় থাকে, তবে এই দলবদল কেবল ইতিহাসের পাতায় এক ছোট পরিচ্ছেদ হয়েই থাকবে। কিন্তু যদি এই নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ সরকারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা হবে এক নতুন লড়াইয়ের সূচনা।
পশ্চিমবঙ্গের এই শিক্ষক আন্দোলনের নতুন এই মোড় আগামী ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে সুমন বিশ্বাস এটুকু প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, বাংলার রাজনীতিতে 'স্থায়ী শত্রু' বা 'স্থায়ী মিত্র' বলে কিছু নেই—সবই পরিবর্তিত সময়ের দাবি।