
কবিতা
যেই
রাষ্ট্র শেখায় কীভাবে পড়বে জামা,
কীভাবে নাড়বে দরজার কড়া ধরে,
কীভাবে শিশুরা কোন ঘরে দেবে হামা,
ক’টার সময় মেয়েরা ফিরবে ঘরে।
কীভাবে ধরবে চায়ের গরম কাপ,
কোন খাবারটা খেলেই মিলবে সাজা,
জন্মের পর পড়ে যাবে পিঠে ছাপ,
অবাধ্য হলে বন্দি করবে রাজা।
সেই রাষ্ট্রের ভেঙেছে দরজা আজ,
আগুন জ্বলেছে ডিসেম্বরের শীতে,
গভীর মেঘের তলায় নেমেছে বাজ,
মানুষ নিয়েছে মৃত্যুভয়কে জিতে।
ইরানের পথে মৃত্যুমিছিল চলে,
তেহরান জুড়ে কালো ধোঁয়া আর রক্ত,
রাজার ছবিতে নেশার আগুন জ্বলে,
শিকল যে আজ টেকানো ভীষণ শক্ত।

আরব সাগরে ইতিহাস ভাঙা ঢেউ,
আছাড় খাচ্ছে জোয়ার-ভাঁটার গান,
এই পাগলামি কখনও দেখেনি কেউ,
বুলেটে বুলেটে ঢেকে গেছে তেহরান।
যেই কারাগারে অর্ধশতক জুড়ে
মেয়েরা বন্দি কালো পর্দার টানে,
ফটোয় জ্বলছে সুলতান খামেনেই,
দস্যি মেয়ের সিগারেট সুখটানে।
মুদ্রার দাম খাদের কিনারে এসে,
এলোমেলো হয় অর্থনীতির তাল,
মৃতদেহদের গড়িয়ে পড়ার শব্দে
চুরমার হয় ইরানিয়ান রিয়াল।

মৌলবাদকে করতে গিয়ে বরণ,
বাজার দরের চূড়ান্ত বিভীষিকা,
মুদ্রাপতনে প্রতিধ্বনি রণন,
নিভিয়ে দিয়েছে নিয়মের বর্তিকা।
তাইতো আজকে সুনামির মতো ঢেউ,
জনতা নেমেছে তেহরান রাজপথে,
দুই সহস্র লাশের রক্তনদী
তৈরি করেছে অববাহিকার ক্ষতে।
আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে,
যখন ছিল না খামেনেইদের ছায়া,
পারস্য উপসাগর তখন জেগে
সভ্যতা শুরু করেছিল এক মায়া।
সেই মায়াবীর জাদুকাঠি সেইদিন
পারস্য দেশে সভ্যতা শুরু করে,
ইন্দ্রজালের চাকায় প্রথম ঘুরে
পৃথিবীর সেই প্রথম নগর গড়ে।

সেই সভ্যতা থামাতেই এই দেশে
এসেছিল যত মৌলবাদীর দল,
প্রতিক্রিয়ার নর্দমা এসে মিশে
পচে গিয়েছিল করুন নদীর জল।
প্রজন্ম তাই নেমেছে রনাঙ্গনে,
শেষ করে দিতে পরাধীনতার বিষ,
নয়া ইতিহাস রাজধানী তেহরানে—
নতুন ভোরের দুহাজার ছাব্বিশ।
আরব সাগরে ইতিহাস ভাঙা ঢেউ,
আছাড় খাচ্ছে জোয়ার-ভাঁটার গান,
এই বিদ্রোহ কখনও দেখেনি কেউ—
ইরানের বুকে গণ অভ্যুত্থান।
📝 সম্পাদকীয় নোট (Editorial Note)
এই কবিতাটি ইরানের সাম্প্রতিক প্রতিবাদ আন্দোলনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে অনুপ্রাণিত। তেহরানের রাজপথ, নারীর প্রতিবাদ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক সংকট এবং পারস্য সভ্যতার দীর্ঘ স্মৃতি—সবকিছু এখানে প্রতীকী ও কাব্যিক ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে মহিমান্বিত বা লক্ষ্যবস্তু করার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো, দীর্ঘদিনের দমননীতি এবং সাধারণ মানুষের প্রতিরোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই লেখা মতামত ও সৃজনশীল লেখা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটি ইতিহাসের দলিল নয়—বরং ইতিহাসের প্রতি একটি মানবিক ও নৈতিক প্রতিক্রিয়া।