তারিখ: ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ এক কঠিন জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে নিপা ভাইরাসের (NiV) সংক্রমণের খবর পাওয়ার পর রাজ্যজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের দ্রুত পদক্ষেপ এবং কেন্দ্রীয় দলের উপস্থিতি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করেছে। ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কন্টাক্ট ট্রেসিং বা সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কাজ পুরোদমে চলছে।
মূল কেন্দ্র: বারাসাত হাসপাতাল ও আক্রান্তের খবর
এই সংকটের সূত্রপাত হয় গত ১১ জানুয়ারি, যখন বারাসাতের একটি বেসরকারি হাসপাতালের দুই নার্সের শরীরে নিপা ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেয়। বর্তমানে তারা দুজনেই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভেন্টিলেশনে রয়েছেন। এর মধ্যে একজন নারী নার্স কোমায় চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
প্রাথমিকভাবে এইমজ (AIIMS) কল্যাণী থেকে পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর, নমুনা পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি (NIV)-তে পাঠানো হয়। ১৪ জানুয়ারি এনআইভি পুনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিপা সংক্রমণের নিশ্চিতকরণ রিপোর্ট দেয়। এরপরই রাজ্যজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়।
কোয়ারেন্টাইন এবং কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের বর্তমান অবস্থা
নিপা ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক, বিশেষ করে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়ায়। তাই প্রশাসন প্রায় ১২০ জনেরও বেশি মানুষকে কড়া নজরদারিতে রেখেছে। নিচে এর একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| এলাকা | কোয়ারেন্টাইনে থাকা সংখ্যা | বিস্তারিত বিবরণ |
|---|---|---|
| বারাসাত হাসপাতাল | ৭০-৮০ জন | ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অ্যাম্বুলেন্স চালক। |
| কাটোয়া (পূর্ব বর্ধমান) | ১০ জন | আক্রান্ত নার্স বাড়ি গিয়েছিলেন, সেখানে তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরা। |
| বর্ধমান মেডিকেল কলেজ | ৩৮ জন | ৮ জন ডাক্তার সহ হাউস স্টাফ। একজন চিকিৎসকের জ্বর থাকলেও বর্তমানে স্থিতিশীল। |
| মোট (রাজ্যজুড়ে) | ১২০+ জন | প্রতিদিন দুবার করে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। |
এখনও পর্যন্ত (১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত) এই কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন কোনো পজিটিভ কেস পাওয়া যায়নি, যা কিছুটা স্বস্তির খবর।
নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি ও শীতকালীন সতর্কতা
নিপা ভাইরাস মূলত ফলখেকো বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই ভাইরাসে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি—প্রায় ৪০% থেকে ৭৫%। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, এই ভাইরাস কোভিড-১৯ এর মতো দ্রুত মহামারি আকার ধারণ না করলেও, স্থানীয়ভাবে এটি অত্যন্ত মারাত্মক।
বর্তমানে শীতকাল হওয়ায় এবং খেজুরের রস সংগ্রহের সময় হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। কাঁচা খেজুরের রসে বাদুড়ের লালা বা মল লেগে থাকলে সেখান থেকে সরাসরি মানুষের শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে।
সরকারি পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক তৎপরতা
কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ: কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে কথা বলেছেন। দিল্লির একটি বিশেষজ্ঞ দল (NJORT) ইতিমধ্যেই রাজ্যে পৌঁছেছে।
চিকিৎসা প্রস্তুতি: কলকাতার বেলেঘাটা আইডি (ID&BG) হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কেরালা মডেল অনুসরণ করে পিপিই কিট এবং আইসিইউ বেড মজুত রাখা হচ্ছে।
হেল্পলাইন নম্বর: সাধারণ মানুষের জন্য তিনটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে: ০৩৩-২৩৩৩০১৮০, ৯৮৭৪৭০৮৮৫৮ এবং ৯৮৩৬০৪৬২১২।
জনসাধারণের জন্য জরুরি নির্দেশিকা
১. কাঁচা খেজুরের রস (তাড়ি) খাবেন না: এটি এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হতে পারে।
২. পাখির খাওয়া ফল খাবেন না: গাছে থাকা অবস্থায় কোনো ফল যদি পাখি বা বাদুড় খেয়ে থাকে, তবে সেই ফল খাওয়া বিপজ্জনক।
৩. পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন: নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোওয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন।
৪. উপসর্গ দেখা দিলে: প্রচণ্ড জ্বর, মাথা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং স্বাস্থ্য দপ্তর পরিস্থিতি কড়া নজরদারিতে রেখেছে। সাধারণ মানুষের সতর্কতা এবং সচেতনতাই পারে এই মারণ ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রুখতে।