ট্রাম্পের নয়া ‘ট্যারিফ যুদ্ধ’: রাশিয়ার পর এবার নিশানায় ইরান, ভারতের সামনে কি চরম সংকট?
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন মানেই এক নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস। বিশেষ করে ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার অপরাধে ভারতের ওপর আগে থেকেই শুল্কের বোঝা চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইরান। আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট শুল্কের পরিমাণ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আজ আমরা বিশ্লেষণ করব ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্য এবং ভারতের শক্তির লড়াই ঠিক কোন পর্যায়ে।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতির মারপ্যাঁচ: ৭৫ শতাংশের খাঁড়া
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বরাবরই আক্রমণাত্মক। তবে এবার তিনি যে পথে হাঁটছেন, তাকে আন্তর্জাতিক মহলে ‘অর্থনৈতিক দাদাগিরি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের রফতানি বাণিজ্যের ওপর এই শুল্কের প্রভাব কীভাবে পড়ছে, তা বুঝতে গেলে একটু হিসাব মেলাতে হবে।
প্রথমত, আমেরিকার নিজস্ব বাণিজ্যিক নীতি অনুযায়ী আমদানিকৃত পণ্যের ওপর একটি সাধারণ শুল্ক থাকে। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনায় ভারতের ওপর ইতিমধ্যেই ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হয়েছে। এর ফলে ভারতের রফতানি পণ্যের ওপর করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশ। এবার ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে যদি আরও ২৫ শতাংশ যোগ হয়, তবে সেই অঙ্কটা দাঁড়াবে ৭৫ শতাংশ।
কল্পনা করুন, একটি ভারতীয় পণ্য যা আমেরিকায় ১০০ টাকায় বিক্রি হতো, এই নীতি কার্যকর হলে তার দাম পড়বে ১৭৫ টাকা। এর ফলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা এক ধাক্কায় তলানিতে এসে ঠেকবে। শুধু তাই নয়, মার্কিন সেনেটে এমন একটি প্রস্তাবও পাস হয়েছে যেখানে রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্টতই ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে চ্যালেঞ্জ করার এক চরম স্পর্ধা।
ইরান-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং বাসমতী চালের লড়াই
ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোনো সাময়িক বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি কয়েক দশকের পুরনো এক বিশ্বস্ত বন্ধুত্ব। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত ও ইরানের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার। মজার বিষয় হলো, এই বাণিজ্যে ভারত আমদানির চেয়ে রফতানি বেশি করে।
ভারত থেকে ইরানে সবচেয়ে বেশি রফতানি হয় বাসমতী চাল, চা, চিনি, জীবনদায়ী ওষুধ, ফল এবং ডাল। বিশেষ করে বাসমতী চাল রফতানিতে ভারত যে আজ বিশ্বের এক নম্বর দেশ হয়ে উঠেছে, তার পেছনে ইরানের চাহিদাই প্রধান কারণ। ট্রাম্পের এই নয়া ঘোষণার ফলে ভারতের কৃষি প্রধান রাজ্যগুলোর কৃষকরা সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। আমেরিকার এই নীতি প্রকারান্তরে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর আঘাত হানার নামান্তর।
চাবাহার বন্দর: ভারতের কৌশলগত তুরুপের তাস
ইরান ইস্যুতে ভারতের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হলো চাবাহার বন্দর। ওমান উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই বন্দরটি ভারতের জন্য এক পরম আশীর্বাদ। পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরে চিন যখন বিশাল বিনিয়োগ করে আরব সাগরে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে চাইছে, তখন ভারত চাবাহারের মাধ্যমে তার যোগ্য জবাব দিয়েছে।
চাবাহার বন্দরের মাধ্যমেই ভারত পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। এই বন্দরটি ভারতের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মাধ্যমেই ভারত পারস্য উপসাগরে চিনা নৌবাহিনীর গতিবিধির ওপর নজরদারি চালাতে পারে। যদিও বর্তমানে এই বন্দরের ওপর আমেরিকার বিশেষ ছাড় রয়েছে, তবে ২০২৬ সালের এপ্রিলের পর ট্রাম্প প্রশাসন এই ছাড় তুলে নিলে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
আমেরিকার ঔদ্ধত্য বনাম ভারতের শক্তি
একদিকে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ভারতকে ‘অপরিহার্য বন্ধু’ বলে অভিহিত করছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের তরফ থেকে আসছে শুল্কের হুমকি। এই দ্বিমুখী আচরণ আসলে ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তির বিরুদ্ধে এক ধরণের প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করার চেষ্টা।
ভারতের বর্তমান শক্তি লুকিয়ে আছে তার বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে। আমেরিকা যদি ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ায়, তবে ভারতও মার্কিন টেকনোলজি বা কৃষি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক বসানোর ক্ষমতা রাখে। এছাড়া, ভারত বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গে রুপি-রুবেল বাণিজ্যের মাধ্যমে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ইরানের সঙ্গেও ভারত বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের পথ খুঁজছে।
ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতের বিদেশনীতি অন্য কোনো দেশের নির্দেশে চালিত হবে না। ট্রাম্পের ৭৫ শতাংশ শুল্কের হুমকি আসলে ভারতের সেই অটল মনোভাবকে টলিয়ে দেওয়ার একটি পরীক্ষা মাত্র।
ভবিষ্যতের পথ: ভারত কি পারবে এই চাপ সামলাতে?
ট্রাম্পের এই নীতি ভারতের জন্য যেমন ঝুঁকির, তেমনি এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিতে পারে। প্রথমত, ভারত যদি তার রফতানি বাজারের পরিধি আরও বৃদ্ধি করতে পারে এবং শুধু আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল না থেকে ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেশি মনোযোগ দেয়, তবে এই ধাক্কা সামলানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর’ (INSTC) প্রকল্প সফল হলে ভারতের মধ্য এশিয়া নির্ভরতা আরও বাড়বে, যেখানে আমেরিকার সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ কম থাকবে।
উপসংহারে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে ভারত একটি ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবেই দেখছে। তবে ভারতের কাছে এখন হারানোর চেয়ে পাওয়ার সুযোগ বেশি। ট্রাম্পের এই চরম ঔদ্ধত্যের মোকাবিলা করার জন্য ভারত যদি নিজের অবস্থানে অনড় থাকে, তবে বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের ‘ভয়েস’ আরও জোরালো হবে। চাবাহার থেকে মস্কো—ভারত তার নিজের স্বার্থেই এই জোট ধরে রাখবে, আর এটাই হবে নয়া ভারতের আসল পরিচয়।