নয়াদিল্লি/ঢাকা, ১০ জানুয়ারি ২০২৬ – বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘ দেড় দশকের অচলাবস্থা ভেঙে এক নতুন এবং অত্যন্ত জটিল অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর দলটির বিতর্কিত উত্তরাধিকারী তারেক রহমান গত ৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় তার এই রাজনৈতিক উত্থান প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের জন্য এক গভীর কূটনৈতিক ও কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ, ১০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গুলশানে বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সাথে তারেক রহমানের প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর পদক্ষেপ। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখানো হলেও, নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকের জন্য এটি মূলত ‘বাস্তববাদী কূটনীতির’ (Realpolitik) একটি অংশ। ভারত কোনোভাবেই চায় না যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তার নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ বিঘ্নিত হোক। তবে তারেক রহমানের অতীত রাজনৈতিক রেকর্ড এবং ভারতের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের ইতিহাস এই নতুন সম্পর্ক স্থাপনের পথে এক বিশাল প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহাসিক তিক্ততা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন: ভারতের জন্য তারেক রহমানের নামটির সাথে জড়িয়ে আছে ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃসহ স্মৃতি। সেই সময়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে উলফা (ULFA), বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে যে, তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী অংশ এবং খোদ তারেক রহমানের প্রশ্রয়েই এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশে অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছিল। ২০০৪ সালের সেই কুখ্যাত ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ আটকের ঘটনাটি ভারত এখনো ভুলে যায়নি, যা ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হয়। তাই তারেক রহমান যখন নতুন করে দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেন, তখন ভারতের সাধারণ মানুষ এবং নীতিনির্ধারকদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ কি আবার সেই পুরনো ‘ভারত-বিরোধিতার’ যুগে ফিরে যাচ্ছে?
কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা বনাম বিশ্বাসযোগ্যতা: বিগত ১৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ভারত তার উত্তর-পূর্ব সীমান্তকে শান্ত রাখতে পেরেছে এবং ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এমতাবস্থায় ভারত কেবল একটি দলের ওপর বাজি ধরে বসে থাকতে পারে না। ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার আজকের এই বৈঠক মূলত তারেক রহমানের মানসিকতা এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পরখ করার একটি প্রয়াস। ভারত এটি নিশ্চিত করতে চায় যে, ভবিষ্যতে যদি ক্ষমতার রদবদল ঘটেও, তবে বাংলাদেশের মাটি যেন পুনরায় ভারত-বিরোধী কোনো উগ্রবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর ব্যবহারের সুযোগ না পায়।
তারেক রহমানের ভাবমূর্তি ও ভারতের সাধারণ জনমত: ভারতের সাধারণ নাগরিক এবং বিশেষজ্ঞদের কাছে তারেক রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং তিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার প্রতীক যা ঐতিহাসিকভাবেই ‘ভারত-বিদ্বেষ’ এবং ‘ধর্মীয় কট্টরপন্থা’র সাথে সম্পৃক্ত। ভারতের সাধারণ জনমত মনে করে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এলে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান ঘটতে পারে, যা সরাসরি ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আজকের বৈঠকে প্রণয় ভার্মা সম্ভবত এই নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগের কথাগুলোই অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তারেক রহমানকে জানিয়ে দিয়েছেন। ভারত একটি স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায়, যেখানে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই। তারেক রহমান কি সত্যিই তার লন্ডনের বিলাসবহুল জীবন এবং পুরনো রাজনৈতিক কৌশল ত্যাগ করে একজন পরিপক্ক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন? ভারতের কাছে এর উত্তর এখনো নেতিবাচক।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও চীনের ছায়া: ভারতের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি অতীতে চীনের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব খর্ব করতে চীন সবসময়ই বিকল্প শক্তির খোঁজ করে। যদি তারেক রহমানের অধীনে বাংলাদেশ চীনের ‘ডেট-ট্র্যাপ’ বা ঋণ-ফাঁদে পা দেয় এবং ভারতের নিরাপত্তা বলয় থেকে দূরে সরে যায়, তবে তা ভারতের জন্য হবে এক দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত বিপর্যয়। আজকের বৈঠকে ভারত সম্ভবত এটিও স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় ভারতের চেয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো অংশীদার নেই এবং তৃতীয় কোনো শক্তির উপস্থিতিকে নয়াদিল্লি ভালো চোখে দেখবে না।
তিস্তা ও সীমান্ত ইস্যুর জট: ভারতের অভ্যন্তরে তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা রয়েছে, তাকে বিএনপি সবসময় ভারত-বিরোধী প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তারেক রহমান কি তার পুরনো জনমোহিনী ভারত-বিরোধী স্লোগান ত্যাগ করতে পারবেন? বর্তমান বাস্তবতায় ভারত চায় এমন একজন অংশীদার যে আবেগ দিয়ে নয়, বরং যুক্তিসঙ্গত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজবে। তারেক রহমানের সাথে প্রণয় ভার্মার আলোচনায় এই অমীমাংসিত ইস্যুগুলো উঠে এলেও, ভারত তার জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না—এটি পরিষ্কার।
উপসংহার: তারেক রহমানের চেয়ারম্যান পদে আসীন হওয়া এবং ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠকটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য একটি ‘মাইলফলক’ হতে পারে, কিন্তু ভারতের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। ভারত এই মুহূর্তে ‘অপেক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ’ (Wait and Watch) নীতি অনুসরণ করছে। নয়াদিল্লি কোনোভাবেই তারেক রহমানকে ‘হিরো’ বা আদর্শ নেতা হিসেবে গ্রহণ করছে না; বরং তাকে একটি সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে যাকে অত্যন্ত সতর্কভাবে মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার প্রতি ভারতের সমর্থন থাকলেও, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত সবসময়ই আপসহীন। তারেক রহমান কি তার অতীত পাপের বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারবেন? নাকি তিনি আবার দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবেন? ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে তিনি এখনো একজন ‘অনির্ভরযোগ্য’ রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা: উল্লেখ্য যে, একই দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তুরস্কের কূটনীতিকদের সাথেও তারেক রহমান বৈঠক করেছেন। এটি স্পষ্ট যে তারেক রহমান নিজেকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভারতের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তুরস্ক বা ইইউ-এর জন্য বাংলাদেশ কেবল একটি দূরবর্তী রাষ্ট্র, কিন্তু ভারতের জন্য এটি তার বাড়ির পাশের আঙিনা। ফলে ভারতের সাথে সম্পর্কের গভীরতা মাপার মাপকাঠি অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হবে। ২০২৬ সালের নির্বাচনই বলে দেবে তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাগ্য এবং ভারতের সাথে তার সম্পর্কের প্রকৃত স্বরূপ।