আন্তর্জাতিক ডেস্ক | জানুয়ারি ১০, ২০২৬
ইরানের রাজপথে এখন বারুদের গন্ধ। অর্থনৈতিক মন্দা, আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেই বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অবস্থান। শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারকো রুবিও এক বার্তায় সরাসরি ইরানের প্রতিবাদী জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এ একটি পোস্টে রুবিও লিখেছেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে রয়েছে।” তার এই একটি বাক্য কেবল একটি সমর্থন নয়, বরং তেহরান সরকারের জন্য এক গভীর কূটনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিক্ষোভের বর্তমান চিত্র ও মার্কিন হুঁশিয়ারি
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ২০২৬-এর জানুয়ারিতে এসে এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। ইরানের রাজধানী তেহরানসহ প্রায় ১৮০টি শহরে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলনে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করছে। আটক করা হয়েছে ২ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষকে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ যদি নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
কেন জ্বলছে ইরান? অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মূল কারণ
ইরানের বর্তমান এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে দেশটির ভেঙে পড়া অর্থনীতি। গত কয়েক বছরে ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) মান রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান প্রায় ১৪.৫ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিক্ষোভের মূল অনুঘটকগুলি হলো:
- মুদ্রাস্ফীতি: ইরানে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার ৪২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি।
- আর্থিক অব্যবস্থাপনা: গত বছর ইসরায়েলের সাথে সরাসরি সামরিক উত্তেজনার ফলে ইরানের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রভাব পড়ে বাজারে।
- বাজেট ক্ষোভ: ২০২৬ সালের বাজেটে নিরাপত্তা খাতে ব্যয় ১৫০ শতাংশ বাড়ানো হলেও সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় অনেক কম রাখা হয়েছে।
এই চরম অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে শুরু হওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট এখন রূপ নিয়েছে সরকার পতনের আন্দোলনে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মার্কিন-ইরান বৈরিতার দীর্ঘ পথ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের এই বিরোধ হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সাত দশকের দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস।
- ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান: ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে হটিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসাতে সিআইএ (CIA) যে ভূমিকা রেখেছিল, তা ছিল আধুনিক দ্বিপাক্ষিক বৈরিতার শুরু।
- ১৯৭৯-এর ইসলামি বিপ্লব: বিপ্লবের মাধ্যমে শাহের পতন এবং মার্কিন দূতাবাসে ৪৪৪ দিনের জিম্মি সংকট দুই দেশের সম্পর্ককে চিরতরে তিক্ত করে তোলে।
- পরমাণু চুক্তি ও নিষেধাজ্ঞা: ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং কাসেম সোলেইমানি হত্যার পর উত্তেজনা চরম শিখরে পৌঁছায়।
- ২০২২-এর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন: মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন ইরানের বর্তমান প্রতিবাদের জন্য ভিত্তি তৈরি করেছিল। ২০২৬-এর এই বিক্ষোভকে অনেকেই সেই অসমাপ্ত লড়াইয়ের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখছেন।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও কঠোর দমন নীতি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই বিক্ষোভকে 'বিদ্রোহ' এবং 'নাশকতা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল এই অস্থিরতায় উস্কানি দিচ্ছে। গত ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে যাতে বিক্ষোভকারীরা সংগঠিত হতে না পারে। দেশটির সেনাবাহিনী এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) ঘোষণা দিয়েছে যে, জননিরাপত্তা রক্ষায় তারা কোনো আপস করবে না।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
মারকো রুবিওর এই বক্তব্য এবং ট্রাম্প প্রশাসনের "ম্যাক্সিমাম প্রেশার" (Maximum Pressure) নীতি ইরানকে বিশ্ব থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। গত সপ্তাহে মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনী লোহিত সাগরে ইরানের একটি তেলবাহী জাহাজ (বেলার ১) আটক করেছে, যা ইরানের অর্থনীতিতে বড় আঘাত।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় তেহরান এখন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক—উভয় দিক থেকেই চাপে রয়েছে।
আগামী দিনের দিকনির্দেশ ও আন্তর্জাতিক নজর
ইরানের সাধারণ মানুষের আন্দোলন এখন আর শুধুমাত্র রুটি-রুজি বা দ্রব্যমূল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ক্রমশ এই প্রতিবাদ রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিচ্ছে। মারকো রুবিওর প্রকাশ্য সমর্থন ইরানের প্রতিবাদী নাগরিকদের মনোবল বাড়ালেও, তেহরানের কট্টরপন্থী শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে তা নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ইরান-আমেরিকা সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করতে পারে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে। আগামী কয়েক সপ্তাহে ইরানি প্রশাসন কোন পথে হাঁটে—সংলাপ নাকি কঠোর দমন—তার ওপরই নির্ভর করছে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ।
আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এখন তেহরানের রাজপথে। এই বিক্ষোভ কি নতুন কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করবে, নাকি শক্ত হাতে দমন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে—তার উত্তর দেবে সময়ই।