গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ হলো নির্বাচন, আর সেই নির্বাচনের ভিত্তি একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা। কিন্তু সেই তালিকা ‘শুদ্ধ’ করার প্রক্রিয়াই যখন সাধারণ মানুষের জীবনের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সম্প্রতি হাওড়া জেলার ডোমজুড় ব্লকের বেলি জগাছা এলাকায় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) চলাকালীন এক ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধের মৃত্যুর ঘটনা রাজ্যজুড়ে শোক ও বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
সেই অভিশপ্ত শুক্রবারের ঘটনা
গত শুক্রবার ডোমজুড় ব্লকের সরকারি দপ্তরে ছিল থিকথিকে ভিড়। লক্ষ্য একটাই—ভোটার তালিকায় নিজের নাম বজায় রাখা। সেই লাইনে নিজের ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন বছর পঁয়ষট্টির মদন ঘোষ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর এবং ভ্যাপসা গরমে তিনি হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন। নিজের বুকের বাঁ দিকে হাত দিয়ে কাতরাতে কাতরাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
উপস্থিত মানুষ ও তাঁর ছেলে দ্রুত তাঁকে হাওড়া হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষরক্ষা হয়নি। চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। প্রাথমিক অনুমান, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানসিক ও শারীরিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
কেন এই ‘Special Intensive Revision’ (SIR)?
সাধারণত প্রতি বছর ভোটার তালিকা সংশোধন হয়, যাকে বলা হয় ‘সামারি রিভিশন’। কিন্তু এবারের SIR প্রক্রিয়াটি তার থেকে অনেক বেশি কঠোর।
নির্বাচন কমিশনের দাবি অনুযায়ী, মৃত ভোটার, একই ব্যক্তির একাধিক নাম এবং অনুপ্রবেশজনিত ত্রুটি দূর করতেই এই গোড়া থেকে সংস্কারের উদ্যোগ।
- বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা – বিএলও দ্বারা নথিপত্র সংগ্রহ
- খসড়া তালিকা প্রকাশ
- শুনানি বা হিয়ারিং – যেখানে সন্দেহ হলে ২০০৩ সালের আগের লিগ্যাসি ডেটা বা হলফনামা দেখাতে হচ্ছে
পরিসংখ্যান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রায় ৫৯ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। যা মোট ভোটারের প্রায় ১০–১৫ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশনের মতে, এই হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অস্বাভাবিক নয়। তবে বিহারের ২০২৪ সালের পাইলট প্রকল্পে দেখা গিয়েছে, অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতা সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক টানাপোড়েন
এই প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গে কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিষয়টি হয়ে উঠেছে আরও স্পর্শকাতর।
শাসকদলের অভিযোগ, এটি নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠীকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, এই প্রক্রিয়াতেই স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব।
কাঠামোগত অভাব ও মানবিক বিপর্যয়
মদন ঘোষের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া, এমনকি মৃত্যুর খবর সামনে আসছে।
- গ্রামীণ ডিজিটাল বিভাজন
- পানীয় জল ও বিশ্রামের অভাব
- একজন বিএলও-র উপর অতিরিক্ত ভোটারের চাপ
উত্তরণের পথ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ভুল ভোটার তালিকা জরুরি হলেও তার জন্য মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়া চলতে পারে না।
- বয়স্কদের জন্য আলাদা সময় বা ভার্চুয়াল শুনানি
- এলাকাভিত্তিক মোবাইল ক্যাম্প
- দিনমজুরদের আর্থিক সুরক্ষা
উপসংহার
“ভোটার কার্ড নাগরিকের পরিচয়, কিন্তু সেই পরিচয় রক্ষা করতে গিয়ে যদি জীবনই দিতে হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য লজ্জাজনক।”
প্রশাসনের মনে রাখা দরকার, ভোটার তালিকা কেবল সংখ্যার খেলা নয়। প্রতিটি নামের পেছনে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ রয়েছেন। তথ্যের শুদ্ধিকরণ যেন আর কখনও প্রাণের বিনিময়ে না হয়— এটাই এখন সাধারণ মানুষের দাবি।